আওয়ামী লীগের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। সংসদ নেতা হিসেবে প্রথমবার এদিন প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন তিনি। সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম। সংসদ সদস্যের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)।
পাচার হওয়া বিপুল এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান সরকারপ্রধান। তারেক রহমান বলেন, অর্থপাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীন) চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দেশের (মালয়েশিয়া, হংকং-চীন ও আরব আমিরাত) সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (এমএলএটি) সইয়ের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। অন্য সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মামলাগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল ও শুল্ক গোয়েন্দা এবং তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।
সম্পদ জব্দের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, বিজ্ঞ আদালত দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছেন। আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ হাজার ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
মামলার হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাচার অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এরই মধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা এবং ৬টি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। সরকারপ্রধান আরও বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে বিএনপি ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে ইশতেহার বাস্তবায়নে এরইমধ্যে অর্জিত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন তিনি। গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত এই প্রশ্নোত্তর পর্বে তাহসিনা রুশদীর উত্থাপিত প্রথম প্রশ্নটি ছিল- সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত বিভিন্ন কার্যক্রমের কী কী অগ্রগতি সাধিত হয়েছে? তার প্রশ্নের জবাব দিতে উঠে দাঁড়াতেই সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ বিরোধী সদস্যরাও সরকারি দলের সদস্যদের সঙ্গে তাল মেলান।
তাহসিনা রুশদীকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের জন্য সকল মন্ত্রণালয় আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এরইমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭,৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা প্রদানে সরকার কৃষক কার্ড প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ০৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে পাইলটিং করা হবে। এছাড়া, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার এরইমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।’
ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিতদের সম্মানী দেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে ইদুল ফিতরের পূর্বেই ৩২৯৫ জন ইমাম, ২৯৭৫ জন মুয়াজ্জিন, ২৬০৪ জন খাদেম এবং হিন্দু মন্দিরের ১১৪ জন পুরোহিত, ৮৩ জন সেবাইত, বৌদ্ধ বিহার, প্যাগোডার ১৫ জন অধ্যক্ষ ও ১৬ জন উপাধ্যক্ষসহ সর্বমোট ৯১০২ (নয় হাজার একশত দুই) জন উপকারভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্মানী প্রেরণ করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ই-হেলথ কার্ড প্রদান’ বিষয়ে পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় খুলনা জেলায় ২৫ লাখ ই-হেলথ্ কার্ড প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
২০ হাজার কিমি. খাল খনন ও বনায়ন কর্মসূচির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে ২০,০০০ কিমি. খাল খনন, পুনঃখনন কর্মসূচি গত ১৬ মার্চ, ২০২৬ হতে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ১২০৪ কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন করবে। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জুন ২০২৬ পর্যন্ত কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা), টিআর (টেস্ট রিলিফ)-এর মাধ্যমে ১৫০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, সংস্কার করা হবে।’
বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থানের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বনায়ন সৃজনের জন্য এরইমধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন করা হয়েছে। উৎপাদিত চারাগুলো চলতি বছর আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।’ এ অর্থবছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে, ৩৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে এবং ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইটালিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জুন, ২০২৬ এর মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
এমনকি সারা দেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কর্মকৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
হাই-টেক, সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে Paypal -এর কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে বেতন কাঠামোর আওতায় জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া ভাতা’ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যার মধ্যে প্রথম ধাপে ১২৯ জন আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ০৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির পূর্বেই Certificate of Eligibility (CoE)-এর ভিত্তিতে এ ঋণ প্রদান সহজীকরণ করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সম্পূরক প্রশ্ন হিসেবে তাহসিনা রুশদী প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান ‘কৃষক কার্ড’ কবে থেকে প্রদান করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পাইলট কর্মসূচির অংশ হিসেবে কৃষক কার্ড ইনশাআল্লাহ আগীম ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে প্রদান করা হবে। এরইমধ্যে আমরা ২২ হাজার কৃষককে এই পাইলট প্রকল্পের আওতায় নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের ১০ টি জেলায় এই কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সকল কৃষকের কাছে এই কার্ড পৌঁছানোর পরিকল্পনা আমাদের সরকারের রয়েছে।
এর আগে গতকাল বুধবার বিকাল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে শুরু হয়। জাতীয় সংসদে তারেক রহমান এই প্রথম প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিলেন। তাহসিনা রুশদীর ছাড়াও সরকার ও বিরোধীদলীয় কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তাদের মধ্যে আছেন পটুয়াখালী-৪ আসনের এবিএম মোশাররফ হোসেন, কুমিল্লা-৯ আসনের আবুল কালাম, ঢাকা-১৯ আসনের দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, কুড়িগ্রাম-২ আসনের আতিকুর রহমান মোজাহিদ ও নরিসংদী-৫ আসনের মো. আশরাফ উদ্দিন।
ভিভিআইপি লাউঞ্জে বসে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব দেখেন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমান। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব নির্দিষ্ট দিনে আয়োজনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। আজ সংসদের মুলতবি অধিবেশনে বক্তব্যকালে একজন সংসদ সদস্য এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন বিশেষ করে গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ রাখা হলে সংসদীয় কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করেছেন ওই সংসদ সদস্য।
স্পিকার মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে প্রশ্নটি রেফার করার নির্দেশ দেন এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান।
আগামী ৪ বছরে ৪ কোটি পরিবার পাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ : নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী চার বছরের মধ্যে দেশব্যাপী ৪ কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস?্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, সংবিধানে [১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ] নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম এই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার। এই কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে, ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।
নারীদের কেন এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে প্রচলিত ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই সহায়তা দেওয়া হলেও দারিদ্র্যের হার কাঙ্ক্ষিত রূপে হ্রাস পায়নি এবং জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটেনি।
দেখা গেছে, কোনো পরিবারের মাকে এ জাতীয় সহায়তা দেওয়া হলে সেটি পরিবারের শিশুসহ অন্যান্য সদস্যের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যবহৃত হয় এবং অর্থের অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের সুযোগ হ্রাস পায়। তিনি আরও বলেন, এ কারণে ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে দেওয়া হবে। এতে একদিকে সহায়তাটি সরাসরি পরিবারের কল্যাণে ব্যয় হবে, অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ডটি নারী প্রধানের নামে হওয়ায় সম্পদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এতে পরিবারে সিদ্ধান্ত প্রদান ও মর্যাদা বৃদ্ধি তথা পরিবার ও সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে।
ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণের হালনাগাদ তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১০ মার্চ (২০২৬) দেশের ১৩টি জেলার ৩টি সিটি কর্পোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এর মাধ্যমে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাকি ৩ মাসে আরও ৩০ হাজার পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী ৪ (চার) বছরের মধ্যে দেশব্যাপী ৪ (চার) কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।
কতজন কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হবে : দেশে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষক রয়েছেন। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সমস্ত কৃষককে ‘কৃষক কার্ডে’র আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে প্রায় ২২ হাজার কৃষককে এই পাইলট প্রজেক্টের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এসব তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ষষ্ঠ দিনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যে কৃষক কার্ডটি দেব, ইনশাআল্লাহ আগামী ১৪ তারিখে পয়লা বৈশাখের দিন চালু করতে যাচ্ছি। এই পাইলট কর্মসূচির আওতায় এরইমধ্যে মোটামুটিভাবে ২২ হাজার কৃষক রয়েছেন। দেশের ১০টি জেলায় এই কর্মসূচি আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। আপনি জিজ্ঞেস করেছেন যে, কবে নাগাদ সমগ্র দেশে এটি সকল কৃষককে আমরা দিতে পারব।”
তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারের কাছে যে হিসাব আছে, তাতে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখের কাছাকাছি কৃষক আছে, প্লাস মাইনাস। ইনশাআল্লাহ পর্যায়ক্রমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চেষ্টা করব, আমাদের সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে সকল কৃষকের কাছে পৌঁছানোর।’
অন্য এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে সরকার প্রধান বলেন, ‘কৃষক কার্ডের জন্য প্রত্যেক সুবিধাভোগীকে বছরে আড়াই হাজার এবং ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্রতি মাসে আড়াই হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। প্রতি বছর বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে কার্ড সংখ্যা বাড়ানো হবে।’
শ্রমিক কার্ড নয়, ফান্ডের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে : দেশে এ মুহূর্তে শ্রমিকদের জন্য কোনো কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে তিনি জানিয়েছেন, শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের অর্থ যাতে সত্যিকার অর্থে শ্রমিকদের জন্য ব্যয় করা হয় তা নিশ্চিত করা হবে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।
মাছুম মোস্তফা বলেন, ‘আপনার মাধ্যমে (স্পিকার) আমি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই, উনি ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছেন এবং কৃষক কার্ড চালু করবেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমিক সমাজের জন্য শ্রমিক কার্ড চালুর কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না?’
প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এ মুহূর্তে শ্রমিকদের জন্য কোনো কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। তবে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের যে সব অর্থ আছে, শ্রমিকদের জন্য, শ্রমিক কল্যাণের জন্য- অবশ্যই সেই অর্থ সত্যিকারভাবে শ্রমিকদের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে কি না- আমরা সেটিকে অবশ্যই খোঁজখবর করব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব যে- সত্যিকার অর্থ যাতে সঠিকভাবে শ্রমিকদের কল্যাণের জন্যই ব্যয় করা হয়। আমাদের সরকারের এটি থাকবে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।’
৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ড থেকে এরইমধ্যে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে। জাতীয় সংসদে নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ মো. আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা জানান, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ড থেকে এরইমধ্যে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে। নরসিংদী সদর উপজেলায় বাগহাটা, বালুসাইর, মহিষাশুর ও খাটরা মৌজায় ৬৯০.২০১৬ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
