ঢাকা-দিল্লি টেকসই সম্পর্কের আশা
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ফারুক আলম

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন আঙ্গিকে টেকসই সম্পর্ক শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের ভারত সফরের আগের দিন সাক্ষাৎটি অনুষ্ঠিত হলো। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী দিল্লি সফর করছেন। সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ঢাকা পাঠিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অন্তর্বর্তী সরকারের পর্ব থেকে উত্তরণের ইঙ্গিত দিয়েছিল দিল্লি। এর ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনের সাক্ষাৎ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দিল্লি সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
গতকাল সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে পাঠানো ছবিতে দেখা যায়, ভারতীয় হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি বই ও একটি শোপিস উপহার দেন। ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে ভারত আগ্রহী। সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভারত থেকে পাইপ লাইনে ডিজেল আনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া, দুই দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করাই লক্ষ্য। দুই দেশের মধ্যে ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থাকলে অনেক কিছুর সমাধান সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিষয়টি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়াধীন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে মরে গেছেন। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বলতে বাংলাদেশে এখন আর কিছু নেই।’ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে অংশ নিতে মরিশাস যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। যাওয়ার পথে ভারতে একটি সৌজন্য সফরও করবেন তারা। সেখানে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।’ দেশের স্বার্থে সীমান্ত হত্যাসহ সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হবে বৈঠকে- এমনটাই জানান হুমায়ুন কবির।
এদিকে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার থেকে ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ জানতে ও বুঝতে চাইবে। পাশাপাশি শুধু বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই নয়, দীর্ঘ মেয়াদে পারস্পরিক মর্যাদা ও আস্থার ভিত্তিতে সম্পর্কটা এগিয়ে নিতে দুই দেশ যেন সচেষ্ট থাকে, সেই বার্তাও দেবে বাংলাদেশ।
মূলত ১১ ও ১২ এপ্রিল মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের রাজধানীতে যাবেন। দিল্লিতে তার সফরসঙ্গী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ভারতের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন মরিশাসে দুই দিনের ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সের আয়োজন করেছে।
দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আজ বিকেলে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ সন্ধ্যায় দিল্লিতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আগামীকাল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ও পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে। দিল্লি থেকে ৯ এপ্রিল দুপুরে পোর্ট লুইসের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
সফর প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘দিল্লি সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। এসব আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হবে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই।’
বাংলাদেশের কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর হবে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরির সফর। এই সফরের ধারাবাহিকতায় শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগসহ সহযোগিতার অন্যান্য বিষয় এগোবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের বিবর্তনের রোডম্যাপ কেমন হতে পারে, তা আসবে দিল্লির আলোচনায়। তাই এবারের আলোচনায় ইস্যুর অগ্রাধিকারের চেয়ে সম্পর্ক নিয়ে দুই পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান বিনিময়ের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে, দেরিতে হলেও ভারত সেটি অনুধাবন করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের যে সমীকরণ ছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান বাস্তবতা মেনে নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, দিল্লির সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক চায় ঢাকা, যেটা হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। কারও চাপিয়ে দেওয়া নয়, এই বার্তাই দেওয়া হবে এই সফরে। গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী তিক্ততার অধ্যায় পেরিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগটা কোথায় কোথায় রয়েছে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারতকেও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যা সরাসরি জনগণের জীবনে প্রভাব ফেলে। যেমন নির্বাচনের পর বাংলাদেশের মিশনগুলোতে ভারতীয়দের জন্য ভিসা পুরোদমে চালু হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সব শ্রেণির ভিসা এখনো চালু করেনি ভারত। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ভারতের আকাশপথ ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি, স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের ছয়টি পণ্য ভারতে রপ্তানি এবং বাংলাদেশের ৯ ধরনের পাটজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। ওই বিধিনিষেধ এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে ভারতের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই ইস্যুগুলোর সুরাহা জরুরি।
জানা গেছে, দুই দেশের আলোচনায় সব ধরনের ভারতীয় ভিসা পুরোদমে চালু, বাণিজ্যের পথ সুগম, জ্বালানি সহযোগিতা, গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে সহযোগিতা ও সীমান্তে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো আসতে পারে।
