‘গণভোটের রায় আদায় করেই ছাড়ব’
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংসদ মানুক আর না-মানুক, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব, আদায় করেই ছাড়ব বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামী আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, যেদিন গণভোটের গণ রায়কে অস্বীকার করা হয়েছে, সেই দিন থেকেই নতুন করে আবার ফ্যাসিবাদের যাত্রা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। আমরা এই কদম কদম যাত্রা থামিয়ে দেব, ইনশা আল্লাহ। আমরা আগাতে দেব না।
গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভার প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান।
অতীতের কথা উল্লেখ করে তাঁদের আনা বিল ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বলেছিলাম, চেয়েছিলাম সংসদে অধিকার দিয়ে আমাদেরকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। আমরা জনগণকে নিয়েই দাবি আদায় করব এবং দাবি আদায় হয়েছে। এবারও আমরা চেয়েছিলাম সংসদের ভেতরে ইতিবাচক গঠনমূলক বিতর্কের মধ্য দিয়ে তার অবসান হোক। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হোক। কিন্তু না! এই সংসদ আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করতে, সম্মান করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা তাই বলেছি, জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য এখন আমরা সংসদ থেকে জনগণের কাছেই ফিরে যাচ্ছি। গত পরশুদিন জনগণকে সাথে নিয়ে প্রথম কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। এটা শুরু। এর ভেতর দিয়ে ইনশা আল্লাহ যে আন্দোলন গড়ে উঠবে, সেটা কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য হবে না। এটা হবে ১৮ কোটি মানুষের জন্য।
বর্তমান সংসদে সদস্য হিসেবে যাঁরা ঢোকার সুযোগ পেয়েছেন বা প্রবেশ করেছেন এদের সবাইকেই ‘মজলুম’ বলে উল্লেখ করে এই বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সংসদ সদস্যের মধ্যে কেউ জেল খেটেছেন, কেউ কুখ্যাত আয়না ঘরে ছিলেন, কেউ ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন। আবার এর মধ্যে কেউ নির্বাসন থেকেও দেশে ফিরে এসেছেন। এ রকম লোকদেরকে নিয়েই আমাদের বর্তমান সংসদ। এই সংসদ যদি মজলুম জনগণের দুঃখ না বোঝে, তাহলে কোন দিনের কোন সংসদ বুঝবে? এটি হবে চরম লজ্জার।
৫৪ বছরের দফায় দফায় যে ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশি জাতিকে এগিয়ে যেতে দেয়নি বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ৫৪ বছরের সেই ফ্যাসিবাদকে ২৪-এর বিপ্লবীরা ছুড়ে মেরেছিল বঙ্গোপসাগরে। নালায়-নর্দমায় ফেলে দিয়েছিল। এখন সেই নর্দমা থেকে এটাকে তুলে আনতে চায় কারা? মনে রাখা দরকার এই প্রজন্ম প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এ প্রজন্ম যখন জেগে উঠে তখন মাসের পর মাস, আর বছরের বছর আন্দোলন করার প্রয়োজন হয় না। তখন ওদের বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তই ফ্যাসিবাদীদের কলিজায় কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রজন্ম যথাযথভাবেই এখনো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। তাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা তাদের সাথে আছি। তারাও আমাদের সাথে আছে।
তিনি বলেন, কথা দিচ্ছি প্রিয় বাংলাদেশে রক্তমূল্য, জীবন মূল্য, জেল মূল্য— যত মূল্য দিতে হয় ফ্যাসিবাদকে আর আমরা ফিরে আসতে দেব না, ইনশা আল্লাহ।
বিএনপির উদ্দেশ ও ফ্যাসিবাদ কাঠামোর কথা উল্লেখ করে সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মদ জায়গায় থাকবে আর শুধু বোতল পরিবর্তন করা হবে —এটা আমরা চাই না। আমাদের এই জেনজিরা একজনকে সরাইয়া আরেকজনকে বসানোর জন্য এখানে আন্দোলন করে নাই। তারা ব্যক্তির এবং লিঙ্গের পরিবর্তন করার জন্য যুদ্ধ করে নাই। তারা লড়াই করেছে যে বন্দোবস্ত এই জাতিকে ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে পৃষ্ঠ করেছিল, সেই বন্দোবস্ত পরিবর্তনের জন্য। এটা আমাদেরও লড়াই। তাই ন্যায় এবং ইনসাফের ভিত্তিতে একটা দেশ এবং জাতি গঠন করতে হলে একটা দলের নিজের ভেতরেই আগে ন্যায়, ইনসাফ এবং গণতন্ত্রের চর্চা হতে হবে। যারা নিজের দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারে না, যাদের নিজেদের নেতা কর্মীদের হাতে নিজেদের নেতা কর্মীরাই নিরাপদ নয়, তারা ১৮ কোটি মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তারা জনগণকে গণতন্ত্র উপহার দিতে পারবে না। তারা ন্যায় এবং ইনসাফ জাতিকে উপহার দিতে পারবে না। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২৪-এর সেই জনগণ ঠিক রায় দিয়েছে। হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন রায় যদি আপনারা পেয়ে থাকেন, তাহলে সরকার গঠন করতে পারলেন না কেন? আমাদের রায়কে হাইজ্যাক করা হয়েছে, ডাকাতি করা হয়েছে, জনগণকে অপমান করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই তার রাজসাক্ষীও পাওয়া গেছে। ঘুঘু বারবার আসে ধান খেয়ে চলে যেতে। কিন্তু কপাল যখন মন্দ তখন জালে বেঁধে যায়। ঘুঘু তুমি একবার জনগণের ধান খেয়েছ আবার খাওয়ার চিন্তা করো না। এবার আসলে ঠিক তোমার লেজে তোমার পাখি, তোমার ডানা, অবশ করে দেওয়া হবে। এবার বলবেন যে আপনাদেরকে জনগণ ভোট দিয়েছে তার প্রমাণ কি? ৭০ ভাগ জনগণ ‘হ্যাঁ’ পক্ষে ভোট দিয়েছে, এটাই তার প্রমাণ। আমরা ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ছিলাম, আমরা ’হ্যাঁ’র পক্ষে আছি। আমরা জনগণের সুপ্রিম উইলে সম্মান দেখিয়েছি, দেখিয়ে যাব।
আমরা ৭৭ জন যাঁরা আপনাদের (জনগণ) হয়ে সংসদের ভেতরে ঢুকেছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ৭৭ জন ১৮ কোটি মানুষকেও পাহারা দেব। আর সংসদের ভেতরে জাতির কপাল নিয়ে কেউ ডাকাতি বা ছিনিমিনি করতে না পারে তারও পাহারা দেব। আমরা কোনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করব না এবং অন্যায়ের ব্যাপারে ছাড়ও দেব না। আমাদের পলিসি স্পষ্ট যে, ন্যায় কাজে সহযোগিতা সমর্থন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ সেই দেয়াল আমরা তুলে রাখব, ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ এই বাংলাদেশকে নব্য ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করে দিন। এই লড়াইয়ে সকল জনতাকে শরিক হওয়ার জন্য আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।
