ভেস্তে গেল আলোচনা আবার যুদ্ধের শঙ্কা
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ থামাতে ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দীর্ঘ বৈঠক শেষে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা একে-অপরের ওপর দোষারোপ করছেন। এতে আবারও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈঠক শেষে পাকিস্তান ছেড়েছে দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য কোনো তারিখ বা স্থান নির্ধারিত হয়নি। তবে উভয়পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে কূটনীতির পথ এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
ইলামবাদে আলোচনা শেষে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এ দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) গতকাল রোববার দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে একটি ‘মৌলিক প্রতিশ্রুতি’ চাইছে ওয়াশিংটন। তবে এ আলোচনায় তেমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ বৈঠক। গত ৫০ বছরের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা। তবে গতকাল সকালে কোনো সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার ঘোষণা দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বৈঠক শেষে জেডি ভ্যান্স বলেন, আলোচনা ভেস্তে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ‘খারাপ খবর’। তিনি জানান, তারা একটি চূড়ান্ত ও শ্রেষ্ঠ প্রস্তাব দিয়ে এসেছেন এবং এখন দেখার বিষয় ইরান সেটি গ্রহণ করে কি না। ভ্যান্সের মতে, আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার পাওয়া, যা এখনও অর্জিত হয়নি। তিনি আরও জানান, ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই আলোচনায় তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন। তবে ট্রাম্প নিজে এ বিষয়ে কিছুটা নির্ভার ছিলেন। মিয়ামিতে একটি কুস্তি প্রতিযোগিতায় (ইউএফসি) যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলো কি না, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।’
এদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, তেহরান মনে করছে এখন ‘বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে’। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ‘যৌক্তিক প্রস্তাব’ দিলেও ওয়াশিংটন তা গ্রহণ করেনি। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের সদিচ্ছা ছিল, কিন্তু আগের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে আমরা প্রতিপক্ষকে বিশ্বাস করতে পারছি না।’ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, কয়েক সপ্তাহের সংঘাত ও গভীর অবিশ্বাসের পর মাত্র এক রাউন্ডের আলোচনায় সব মিটে যাবে, এমনটা ভাবা অবাস্তব। তিনি জানান, কিছু বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হলেও দুই-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনও গভীর মতভেদ রয়েছে। আলোচনায় মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগে তেহরানের অস্বীকৃতি। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেওয়া শর্ত না মানলে হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় যেসব দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধেও পায়নি- ইরান : পাকিস্তান সফররত ইরানের প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির ফার্স নিউজ এজেন্সি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় এমন কিছু বিষয় দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট ওই সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালী, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি ও আরও বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী শর্তগুলো তেহরান মেনে নেয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বিবৃতিতে আলোচনায় কোন কোন বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে, তা তুলে ধরেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইসমাইল বাগাই বলেন, ‘পাকিস্তানের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও মধ্যস্থতায় শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া নিবিড় আলোচনা এখন পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে অসংখ্য বার্তা ও খসড়া বিনিময় হয়েছে।’ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও লিখেছেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় আলোচনার মূল বিষয়গুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, পারমাণবিক ইস্যু, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে ও এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান।’ যুক্তরাষ্ট্রকে সদিচ্ছা দেখানোর আহ্বান জানিয়ে ইসমাইল বাগাই লিখেছেন, ‘এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করছে প্রতিপক্ষের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ওপর। পাশাপাশি তাদের অতিরিক্ত ও বেআইনি দাবি থেকে বিরত থাকা এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থকে মেনে নেওয়ার ওপরও এটি নির্ভরশীল।’
আলোচনা থেকে সরে দাঁড়াতে ‘অজুহাত খুঁজছে’ যুক্তরাষ্ট্র দাবি ইরানি সূত্রের : ইরানের প্রতিনিধিদলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির ফার্স নিউজ এজেন্সি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়াতে ‘অজুহাত খুঁজছে’। সংশ্লিষ্ট ওই সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের এ আলোচনার প্রয়োজন ছিল। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয় ও অচলাবস্থা তৈরি হলেও তারা তাদের উচ্চাভিলাষী অবস্থান থেকে সরতে নারাজ। সূত্রটি আরও জানায়, ইরানের পক্ষ থেকে পরবর্তী দফার আলোচনার আর কোনো পরিকল্পনা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের আস্থা নেই- ইরানের স্পিকার : ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মাদ বাগের গালিবাফ বলেছেন, সাম্প্রতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি জানান, আলোচনার শুরুতেই ইরান সদিচ্ছা ও ইচ্ছা প্রদর্শন করেছিল। তবে আগের দুই দফা যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিপক্ষের প্রতি আমাদের আস্থা নেই। তিনি বলেন, এই দফার আলোচনায় প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত ইরানি প্রতিনিধিদলের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া আলোচনার মধ্যস্থতায় সহায়তার জন্য পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি এবং দেশটির জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এদিকে ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়া নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, শান্তি আলোচনায় সব বিষয়ে তাদের মতানৈক্য হয়নি, অনেকগুলো বিষয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমতও হয়েছিলেন। ইরান নিউজ নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসমাইল বাঘাই বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মোট ২৪ থেকে ২৫টি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে আমরা মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছি। তবে দুই বা তিনটি ক্ষেত্রে মতপার্থক্য ছিল এবং সেখানে আমরা কোনো সমেঝাতায় পৌঁছাতে সক্ষম হইনি। তবে ঠিক কোন বিষয়গুলোতে মতানৈক্য হয়েছিল সেটা তিনি স্পষ্ট করে বলেননি। ইসমাইল বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালী এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির মতো নতুন বিষয়গুলো যুক্ত হওয়ায় আলোচনা আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এদিকে এর আগে আরেক সাক্ষাৎকারে ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যে দ্রুতই একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, তা কখনোই প্রত্যাশিত ছিল না।
পাকিস্তানে ব্যর্থ আলোচনার পর ট্রাম্পের নীরবতা ‘খুবই উদ্বেগজনক’ : অতীতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নানা বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা চলেছে। ২০১৫ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি হওয়ার আগেও কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলেছিল। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে আগেও আলোচনার অনেক বিষয় ছিল, আর এখন আগের তুলনায় আরও অনেক বেশি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কারণ, যুদ্ধের ফলে বাস্তবেই কিছু নতুন নতুন ইস্যু তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালীর বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আমরা এমন একটি অবস্থায় আছি, যেখানে ইসলামাবাদে শুরু হওয়া কূটনৈতিক আলোচনা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু কূটনীতি কি সত্যিই শেষ হয়েছে? আগামী কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটতে চলেছে- সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আর আমরা এখনও সেই একজনের কাছ থেকে কিছুই শুনিনি, যার কাছ থেকে শোনা সবচেয়ে জরুরি, তিনিই আসলে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। আমরা জে ডি ভ্যান্সের কাছ থেকে কী কী সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে শুনেছি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের কথায় মনে হয়েছে, একটি চুক্তি বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এখনও আলোচনার টেবিলে রয়েছে এবং ইরান এখনও সেটি বিবেচনায় নিয়ে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কী বলতে চলেছেন?
তিনি এখনও কিছু বলেননি। আর এই নীরবতা খুবই উদ্বেগের। তার এই নীরবতা প্রচণ্ড চিৎকারের মতো কানে লাগছে। কারণ, আমরা জানি, মাত্র কয়েক দিন আগেই বিশ্ব কতটা ভয়াবহ অবস্থায় ছিল, যখন তিনি টুইট করেছিলেন- ‘একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা আজ রাতে ধ্বংস হয়ে যাবে, আর কখনো ফিরে আসবে না। কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টার আরেকটি কঠিন বাস্তবতা হলো- যুদ্ধের দিকে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা। অবশ্য এখনও যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে এবং এর মেয়াদ আরও প্রায় ১০ দিন বাকি। একমাত্র ইসরায়েল ছাড়া পাকিস্তানসহ পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাইবে এই যুদ্ধবিরতি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বহাল থাকুক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালালে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়, সেই সঙ্গে একটি শান্তি আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তও হয়। গত শনিবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে ওই আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু ২১ ঘণ্টার এই আলোচনা সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত ইরানের : ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধি দলের প্রধান মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ পরবর্তী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আজ রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স- এ বেশ কয়েকটি পোস্ট করেন তিনি। গালিবাফ বলেন, আলোচনার এই পর্বে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু এখন এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না। পাকিস্তানে আলোচনার ব্যর্থতার পর প্রথমবারের মতো মন্তব্য করে গালিবাফ বিজয়ের সুর বজায় রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সব সময় ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষায় সামরিক অ্যাকশনের সমান্তরালে শক্তিশালী কূটনীতির ওপর জোর দিই। আমরা জাতীয় প্রতিরক্ষায় ৪০ দিনের অর্জনগুলো সুরক্ষিত করতে কাজ চালিয়ে যাওয়া এক মুহূর্তের জন্যও থামাব না।’ ইরানের আলোচক দলের প্রধান গালিবাফ আলোচনার মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের বন্ধু ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ পাকিস্তানের প্রচেষ্টার জন্যও কৃতজ্ঞ। তারা এই আলোচনার প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে সাহায্য করেছে। পাকিস্তানের জনগণের প্রতি আমার শুভেচ্ছা জানাই।’
হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে, টোল দিতে হবে রিয়ালে : ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। এ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পরিবহন করা হয়। ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ বলেছে, দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি হরমুজ প্রণালীকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, প্রণালীটি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং এখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অবশ্যই ইরানি মুদ্রা ‘রিয়ালে’ টোল পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে, গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ জলপথ ‘শিগগিরই খুলে দেওয়া’ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের দুটি সামরিক জাহাজ এরইমধ্যে প্রণালীটি অতিক্রম করেছে। সমুদ্র থেকে মাইন অপসারণের একটি ব্যাপক অভিযানের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করে। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেকোনো সামরিক জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাধারণ বেসামরিক জাহাজগুলোকে সুনির্দিষ্ট শর্তে এখান দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখবে, আশাবাদী পাকিস্তান : ইসলামাবাদে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, আজ রোববার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যকার বৈঠক শেষ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ আগামীতেও ‘ইতিবাচক মনোভাব’ বজায় রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ইসহাক দার বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টা ধরে দুপক্ষের মধ্যে চলা কয়েক দফার নিবিড় ও গঠনমূলক আলোচনায় আমি নিজে এবং চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির মধ্যস্থতা করেছি।’ ইসহাক দার আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করায় আমি উভয় পক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।’ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আশা প্রকাশ করে বলেন, পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে উভয় পক্ষ এ ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখবে।
হতাশা প্রকাশ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর : আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এবং ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং দুপক্ষকেই যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে পুনরায় আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দুপক্ষকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। পাকিস্তান এই সংলাপ চালিয়ে যেতে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং আবারও আলোচনায় ফেরা।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদের বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে পেনি ওং বলেন, ‘এটি অত্যন্ত হতাশাজনক যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।’
হরমুজ প্রণালী ‘অবরোধের’ ঘোষণা ট্রাম্পের : ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এবার হরমুজ প্রণালী ‘অবরোধ’ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, মার্কিন নৌবাহিনী অবিলম্বে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশই এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের ময়দানে ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি কেড়ে নিতেই ট্রাম্প এই কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
নিজের পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, অবিলম্বে কার্যকর হওয়া এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের সেরা নৌবাহিনী, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টাকারী যেকোনো জাহাজ অবরোধ করা শুরু করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, তিনি নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আন্তর্জাতিক জলসীমায় এমন প্রতিটি জাহাজকে খুঁজে বের করা হয় এবং বাধা দেওয়া হয়, যারা ইরানকে মাশুল দিয়েছে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, যারা ইরানকে অবৈধভাবে টোল দেবে, গভীর সমুদ্রে তাদের নিরাপদ চলাচলের কোনো নিশ্চয়তা থাকবে না। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই মূল কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শেষ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। ট্রাম্প তার পোস্টে আরও লিখেছেন, সঠিক সময়ে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত থাকব এবং আমাদের সামরিক বাহিনী ইরানের যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা শেষ করে দেবে!
ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা : লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের ইয়ারুন নামের একটি অবৈধ বসতিতে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। সংগঠনটি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের দেশ ও জনগণের ওপর ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।’
