মধ্যপ্রাচ্যের সব বন্দরে হামলার হুমকি ইরানের
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আলোচনায় যুদ্ধ বন্ধের সুরাহা না হওয়ায় ফের ইরান ও যুদ্ধরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এবার হরমুজ প্রণালি ‘অবরোধ’ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হুঁমকির জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বলেছেন, যেভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে একটি ঐতিহাসিক পরাজয়ের মুখে পড়েছিল, তেমনিভাবে যেকোনো নৌ অবরোধের ক্ষেত্রেও তারা ব্যর্থ হতে বাধ্য। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলাকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছে একটি ফোন আসে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওই ফোনকলের পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায় বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে দাবি করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আরাগচি তার পোস্টে লেখেন, ‘বৈঠকের সময় ভ্যান্সের কাছে আসা নেতানিয়াহুর ফোনকল আলোচনার মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ওপর থেকে সরিয়ে ইসরায়েলের স্বার্থের দিকে নিয়ে যায়। আরাগচি আরও লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে সেসব লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করতে পারেনি।’
মধ্যপ্রাচ্যের সব বন্দরে হামলার হুমকি ইরানের : ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির সব বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সোমবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তারা পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সব বন্দর অনিরাপদ করে তোলার হুমকি দিয়েছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সোমবার জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের নিরাপত্তা হয় সবার জন্য থাকবে, নয়তো কারো জন্য নয়। এই অঞ্চলের কোনও বন্দরই নিরাপদ থাকবে না। দেশটির সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) পক্ষ থেকেও একই ধরনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার ইডিটি সময় সকাল ১০টা (ইরান সময় বিকাল সাড়ে পাঁচটা) থেকে এই অবরোধ শুরু হবে।
যেকোনো নৌ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিশ্চিত : ইরানের সর্বোচ্চ নেতার একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা বলেছেন, যেকোনো নৌ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিশ্চিত। হরমুজ প্রণালি অবরোধের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষাপটে এ মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই। মোহসেন রেজাই বলেন, যেভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে একটি ঐতিহাসিক পরাজয়ের মুখে পড়েছিল, তেমনিভাবে যেকোনো নৌ অবরোধের ক্ষেত্রেও তারা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
অনড় ইরান সরকার সমর্থকদের সড়কে থাকার আহ্বান : ইরান সরকার বলেছে, যুদ্ধ অবসানে কোনো চুক্তি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে, একই সঙ্গে তারা নিজেদের সমর্থকদের সড়ক দখল করে রাখার আহ্বান জানিয়েছে। ইরান যুদ্ধ অবসানের উপায় খুঁজে পেতে গত শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসেছিলেন তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরা। কিন্তু ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেও কোনো চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘এই দফার আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদল শেষ পর্যন্ত ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।’ বাঘের গালিবাফ ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
হরমুজ ইস্যুতে উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রকে সংযমের আহ্বান চীনের : ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধের হুমকি দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে, আর এই প্রেক্ষাপটে সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে চীন। সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং বাধামুক্ত রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। যদিও তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক অবস্থানের প্রতি ইঙ্গিত ছিল। চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ হলো চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি। বেইজিং মনে করে, উত্তেজনা বাড়ানোর পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার পথেই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
হরমুজ প্রণালি অবরোধে অসম্মতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর : যেকোনও চাপ আসলেও ব্রিটেনকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে নেওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে কোনও ধরনের অবরোধ সমর্থন না করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে। স্টারমার বলেন, আমার দৃষ্টিতে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত এবং সম্পূর্ণ সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েকদিন ধরে আমরা আমাদের সবটুকু প্রচেষ্টা এই লক্ষ্যেই নিয়োজিত করেছি এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখব। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, ব্রিটেনের মাইন অপসারণ সক্ষমতা রয়েছে। তবে এটি ব্যবহার করা হবে কি না সে সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা রাশিয়ার : ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নৌ-অবরোধের কড়া সমালোচনা করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখে পড়বে।
