বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩

উদারতা ও সম্প্রীতির বার্তায় বরণ নতুন বছর

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। যে উৎসব সবার। পহেলা বৈশাখে গোটা দেশ ছিল আনন্দময়। নববর্ষের উচ্ছ্বাসে শামিল হয়েছিলেন সর্বস্তরের মানুষ। সর্বজনীন এ উৎসবে ছিল প্রাণের ছোঁয়া। সঙ্গে ছিল উজ্জ্বল সমৃদ্ধিময় নতুন দিনের প্রত্যাশাও। নতুনভাবে চেতনায় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানানোর আয়োজন ছিল একটু অন্যরকম। দেশজুড়ে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ ছাড়াও ছিল বর্ণাঢ্য সব আয়োজন। গ্রাম-শহরে বৈশাখী মেলা, যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, নাগরদোলা ছাড়াও ছিল ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা-ইলিশ। সঙ্গে হালখাতা পালনের ঐতিহ্য। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীসহ অনেকে। রাজধানীতে পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ ছিল ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। উৎসুক মানুষ গত মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা ও শাহবাগ এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। সেখানে ঢল নামে মানুষের। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের হয়। শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ ছিল। সেগুলো হলো মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া। এবারের শোভাযাত্রায় ছিল হাতে আঁকা পটচিত্র, ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি সাজ, লাঠিখেলা, মাছ ধরার সরঞ্জাম, যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান, ঘোড়ার পিঠে সওয়ার পুলিশের সদস্য এবং জাতীয় পতাকা হাতে ছিলেন সর্বস্তরের মানুষ। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রার সূচনা হয়। এতে অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। শোভাযাত্রাটি রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা প্রাঙ্গণে ফিরে আসে। রংবেরঙের পোশাকে আপামর জনতা, বিদেশি নাগরিককেও এতে অংশ নিতে দেখা যায়।

বৈশাখী শোভাযাত্রায় সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বৃহৎ মোরগের প্রতিকৃতি। ভোরে মোরগের ডাক যেমন নতুন দিনের আগমনী বার্তা আসে, তেমনি এ প্রতিকৃতিও নতুন বছর ও জাগরণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলার কৃষিনির্ভর জীবনধারায় মোরগের প্রতীকী গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। বাংলার পথে-প্রান্তর, লোকজ জীবন বৈচিত্র্যময় সুরের আধার। দোতারা এ জনপদের লোকসংগীতের প্রাণ। এ মোটিফ সাংস্কৃতিক শেকড়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। এছাড়া বাউল ও বিভিন্ন প্রান্তিক সুরধারার প্রতি অবহেলা ও সাম্প্রতিক নিগ্রহণের প্রতিবাদও দেন দোতারার মোটিফ। লোকজ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতিকে বৃহৎ আকারে উপস্থাপন করা হয়, যা বাংলার প্রাচীন লোকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা নিয়ে শোভাযাত্রায় রাখা হয় পায়রার মোটিফ।

এ ছাড়া রং-বেরঙের মুখোশ-রাজা-রানীর মুখোশসহ বিভিন্ন প্রতীকী মুখাবয়ব-শোভাযাত্রাকে দেয় অন্যরকম এক বৈচিত্র্যময় রূপ। এ মুখোশগুলো কখনো ক্ষমতার প্রতীক, কখনো ব্যঙ্গ, কখনো বা সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এগুলো বাঙালির চিরায়ত বস্তু সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে শিল্প ও সমাজ একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

বৈশাখী শোভাযাত্রার এ সমগ্র আয়োজনে একটি চলমান শিল্পকর্মণ্ডযেখানে রং, রেখা, সুর, প্রতীক ও দর্শন একসূত্রে গাথা। এটি যেমন শিল্পের প্রকাশ, তেমনি সমাজচেতনারও প্রতিফলন। শোভাযাত্রাটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নও তুলে ধরে। সব জাতিগোষ্ঠী, সব ধর্ম, সব শ্রেণিপেশার মানুষকে একত্রে নিয়ে আসার যে প্রয়াস, তা জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিকে আরও জেবুত করে। বৈশাখী শোভাযাত্রা তাই হয়ে উঠে এক মিলনমেলা-যেখানে বৈচিত্র্যই শক্তি, ভিন্নতাই সৌন্দর্য।

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর মধ্যদিয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এটি আমাদের অতীতের গৌরবকে ধারণ করে, বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি প্রতীক সেই পথচলারই ইঙ্গিত বহন করে। নতুন বছরের প্রত্যাশা-গণতন্ত্রের এ নবযাত্রা হোক সুদৃঢ়, মানবিক মূল্যবোধ হোক প্রাধান্যপ্রাপ্ত এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হোক আরও বিকশিত।