জ্বালানি সংকটে পাম্পে দীর্ঘ লাইন কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন মানুষ

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকাসহ সারাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন চালকরা। এতে প্রতিদিন কর্মঘণ্টা নষ্টের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি লাগছে। জ্বালানি তেল বিতরণে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় নিবন্ধনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা একটি ইউনিক কিউআর কোড পাচ্ছেন, যা নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্পে স্ক্যান করে তেল সংগ্রহ করা যাচ্ছে।

জানা গেছে, ফুয়েল পাসধারী মোটরসাইকেল আরোহীরা সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকার জ্বালানি তেল নিতে পারছেন। তবে সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল। লালবাগের বাসিন্দা মাইনুল হোসেন বলেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। আজ (বুধবার) আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’ ঢাকা-গাজীপুর রুটের ভিআইপি পরিবহনের বাসচালক চাঁন মিয়া নীলক্ষেত মোড়ে বাস রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, গতকাল দুপুরের পর থেকে তেল দেওয়া শুরু হবে বলেছে। তাই সিরিয়াল দিয়ে বসে আছি। সবসময় বাস চালাতে পারি না, তাই আয়ও কমেছে। ইস্কাটনের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সচালক কামাল হোসেন জানান, তেল সংকটে তারা মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে দূরের পথে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও সিএনজি গ্যাসেরও সংকট দেখা দিচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাবে দেশে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সময়মতো ও পর্যাপ্ত জ্বালানি না আসায় পাম্পগুলো গ্রাহকদের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক চাপ—ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যাহত, জরুরি যানবাহনও আটকে পড়ছে সড়কে তীব্র যানজট, গরমে অসুস্থতা এবং ভোগান্তি চরমে উঠছে।

তেল শেষ হওয়ায় মাঝপথে থেমে গেল দূরপাল্লার বাস, যাত্রীদের ভোগান্তি : সিলেট থেকে ৩০ যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিল হানিফ পরিবহনের একটি বাস। প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌঁছায় বাসটি। এরপর তেল শেষ হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপরই বাসটির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গন্তব্যে যাওয়া নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। গতকাল বুধবার সকাল সাতটার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বানুর বাজার এলাকায় বাসটির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেট থেকে রওনা দেয় বাসটি। বুধবার সকাল আটটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের ওপরেই বাসটি থেমে আছে। যাত্রীদের কয়েকজন বন্ধ বাসটিতে বসে রয়েছেন। কয়েকজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্য কোনো যানবাহনে ওঠার চেষ্টা করছেন। যাত্রীরা জানান, জ্বালানি তেল নিতে বাসটির চালকের সহকারী বালতি নিয়ে আশপাশের ফিলিং স্টেশনে ঘুরছেন। তবে এক ঘণ্টা পার হলেও বাসটির জন্য জ্বালানি তেলের কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি।

বাসের যাত্রীদের একজন ওবায়দুর রহমান। তিনি বলেন, কক্সবাজারের টেকনাফে যাওয়ার উদ্দেশে সিলেট থেকে বাসটিতে ওঠেন তিনি। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় বাসটি যাত্রা শুরু করে। এরপর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে সারিতে অপেক্ষার পর জ্বালানি তেল নিয়েছে বাসটি। ১০ লিটার ২০ লিটার করে তেল দেওয়া হয়। ১০ লিটারের বেশি তেল পেতে দুটি ফিলিং স্টেশনে বাড়তি টাকাও দিয়েছেন চালক। এরপরও জ্বালানি তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় বাসের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল।

গভীর রাতে লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাননি জামায়াতের এমপি, সংসদে ক্ষোভ : এদিন সংসদে বিকালের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। জ্বালানি না পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে সংসদে কামাল হোসেন বলেন, গতরাতে আমাকে ২টা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আমি তেল পাইনি। তিনি রসিকতা করে বলেন, তেল শুধু মহান সংসদে- এত পরিমাণ তেল এখানে অপচয় হচ্ছে। বাইরে তেল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

জ্বালানি সংকটের বোঝা সবাইকে ভাগ করে নিতে হবে- প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হওয়া জ্বালানি সংকটের বোঝা সবাইকে ভাগ করে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতো করে এটার কিছু সংকট নিতে হবে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বুধবার সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, শুধু সরকারি খাত নয়, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত ও ব্যয় সীমিত করতে হবে। তবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বাজার ও অফিস কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না করার পক্ষেও মত দেন। সরকারি ব্যয়সংকোচন নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রীদের জ্বালানি বরাদ্দ কমানোর পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে নতুন সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। যেমন- উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি ঋণ সুবিধা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে প্রশাসন ও বিচার বিভাগে জ্বালানি সুবিধা কমানোর বিষয়টি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

দুই মাসে দেশে তেলের সংকট হবে না- জ্বালানি বিভাগ : বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, চলতি এপ্রিল মাস তো বটেই, আগামী দুই মাস দেশে জ্বালানি তেলের কোনও সংকট তৈরি হবে না। বুধবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে ডিজেল মজুত রয়েছে এক লাখ এক হাজার ৩৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ টন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন। এছাড়া, জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে ১৮ হাজার ২২৩ টন।

মনির হোসেন জানান, জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনও ঘাটতি নেই। বরং, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতাই বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে যেমন সরবরাহ ছিল, এখনও একই পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় মানুষ বেশি কিনছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি পাম্পে আগে দৈনিক ৫০ থেকে ৫৪ হাজার লিটার অকটেন সরবরাহ করা হলেও এখন ৮০ হাজার লিটারের বেশি দিয়েও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।

জ্বালানি সাশ্রয়ে সশরীরে সভা আয়োজন পরিহারের নির্দেশনা : বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন সভা, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মাঠ পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীদের ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া সশরীরে সভা আয়োজন পরিহারেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সব সিনিয়র সচিব/সচিব, সকল বিভাগীয় কমিশনার, সকল জেলা প্রশাসক ও সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে জ্বালানি তেলের সাশ্রয় করার পাশাপাশি সরকারি কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকরভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ অবস্থায় মন্ত্রণালয়/বিভাগ থেকে আয়োজিত বিভিন্ন প্রোগ্রাম (যেমন; সভা, কর্মশালা, প্রশিক্ষণ)-এ মাঠ পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীদের ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিভাগীয় পর্যায়ের প্রোগ্রামে জেলা পর্যায় থেকে এবং জেলা পর্যায়ের প্রোগ্রামে উপজেলা পর্যায় থেকে অংশগ্রহণ ভার্চুয়াল মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত সশরীরে সভা আয়োজন পরিহার করতে হবে যাতে যানবাহনের জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ বিষয় যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। এখন জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া একটি বড় উপায় যার মাধ্যমে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসতে পারে। জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া আর অন্য কোনো উপায় নেই।’ তিনি বলেন, চলমান এই সংকটে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত করা অপরাধ। সরকারের আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। অবৈধভাবে মজুত করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করার কিছু অবৈধ ব্যবসায়ী আছে। এ ধরনের লোকজন সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।