মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, উদ্বেগ

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এরইমধ্যে এ রোগে ২০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলা- বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে- হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায়ও তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ।

দেশে গত ১ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও দুজন এবং ভাইরাসজনিত এ রোগের লক্ষণ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৪ জন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ১৭২ জনের মৃত্যু হলো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকালে ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১১৯১ জন হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিতে গেছেন। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষায় ৯২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে ২০ হাজার ৩৫২ জন চিকিৎসা নিতে গেছেন। পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ৩০৬৫ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ১২৯ জন। আর হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১০ হাজার ৪৯৬ জন।

গত এক দিনে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৪৯৬ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ২০৭ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে গেছেন। আর ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৭৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামের লক্ষণ নিয়ে গত ১ দিনে যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজন ঢাকা বিভাগের এবং দুজন সিলেট বিভাগের। এছাড়া একজন করে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের। আর হামে আক্রান্ত হয়ে যে দুজন মারা গেছেন, তারাও ঢাকা বিভাগের। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। আর রাজশাহী বিভাগে মারা গেছেন ৬৫ জন।

হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় হটস্পট নির্ধারণ করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দেশের ৬টি বিভাগে এ পর্যন্ত ১১ লাখ ৩১ হাজার ১২৮ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ বরিশাল ও ময়মনসিং সিটি কর্পোরেশনে ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৪৮ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, অপুষ্টি এবং জনসচেতনতার অভাবের কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে এটি বড় আকারের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

ময়মনসিংহে হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ৩৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন আছে ৮৮ শিশু। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে এসব শিশু ভর্তি হয়। গত ১৭ মার্চ থেকে আজ সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ভর্তি হয়েছে ৫১৫টি শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৪১৪টি শিশু এবং মৃত্যু হয়েছে ১৩টি শিশুর। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১টি শিশু সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছে। একই সময়ে গুরুতর অবস্থায় দুই শিশুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হামের লক্ষণ নিয়ে রোগী ভর্তি হতে শুরু করলেও মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের ৬৪ শয্যার পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ডে তিনটি মেডিকেল টিম কাজ করছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৩টি শিশু ভর্তি হয়েছে। তবে এ সময়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গুরুতর অসুস্থ দুই শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

হাম উপসর্গে রামেক হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছাড়াল : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ১১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালটিতে হাম উপসর্গে এ পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করেন।তিনি জানান, গত ১ দিনে হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে নতুন ভর্তি হয়েছে ১১ জন। চিকিৎসা শেষে ২৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৪৫ জন চিকিৎসাধীন আছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলমান এই সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত মোট ৬১৩ জন রোগী রামেকে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে।

চিকিৎসা ব্যয়ে হিমশিমে অভিভাবকরা : হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। তবে, হামের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে হিশমিশে পড়ছেন অভিভাবকরা। হামের কারণে কখনও কখনও হাসপাতালে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) ভর্তি করতে হয়। সাকিবুর রহমান (ফালাকের বাবা) বলেন, বেশির ভাগ ওষুধ, স্যালাইন ও সিরিঞ্জ বাইরে থেকে কিনে দিতে হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে ২ দিনসহ ছেলের চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে ১ লাখ টাকার বেশি। ১৯ দিন হাসপাতালে থাকায় নিজের দোকানও খুলতে পারেননি। ধারদেনা করা টাকা শোধ তো করতেই হবে। সাকিবুর রহমানের মতো হামে আক্রান্ত শিশুর অভিভাবকরা খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় খরচ কম। তবে যে রোগীকে নিয়ে একাধিক হাসপাতাল ঘুরতে হয়, সেই পরিবারের খরচ অনেক বেড়ে যায়। বেসরকারি হাসপাতালে খরচ আরও বেশি।

রোগীর স্বজনরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে সব ওষুধের সরবরাহ থাকে না। বাইরে থেকে কিনতে হয়। রোগের পরীক্ষা করাতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নিতে যাতায়াত খরচ যুক্ত হয়। হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের খাবার ও নানা কিছু কেনার পেছনে ব্যয় করতে হয়। সব মিলিয়ে স্বল্প আয় ও দরিদ্র পরিবারের জন্য খরচ অনেক। তারপরও সন্তানকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরতে পারলে তবু সান্ত¡না থাকত, অনেকেই সন্তানের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। ফালাকের বাবা সাকিবুর রহমান বলছিলেন, ফালাককে রাজশাহী বা ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা বলেছিলেন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা; কিন্তু সে সামর্থ্য ছিল না তার। আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ।’

অন্তর্বর্তী সরকার হামের টিকা দেশে না আনায় অনেক শিশু মারা গেছে- স্পিকার : জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এদেশের জনগণের জন্য তেমন কিছুই করতে পারেনি। মূলত তাদের অভিজ্ঞতার অভাব। অন্তর্বর্তী সরকারের আরও সমালোচনা করে তিনি বলেন, হামের টিকা দেশে আনেনি। যে কারণে অনেক শিশু মারা গেছে। এভাবে অদক্ষ লোকের হাতে দেশ পড়লে মানুষের অনেক ভোগান্তি হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে ভোলার সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। স্পিকার বলেন, ?‘তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) নিরপেক্ষ সরকার ছিল; কিন্তু অভিজ্ঞতার কারণে দেশ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি। তবে তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করেছে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) চিকিৎসক মঈনুল আহসান বলেন, দেশে করোনা, ডেঙ্গু, হাম- একটার পর একটা রোগ লেগেই আছে। বর্তমানে হামের যে চিকিৎসা, তা জেলা শহর আর ঢাকার হাসপাতালের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ), বিশেষ করে পিআইসিইউ সেবা লাগলে তখন পরিস্থিতি একটু বেশি জটিল হচ্ছে। শিশুদের পিআইসিইউয়ের স্বল্পতা আছে। তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ জনবল এবং যন্ত্রপাতিরও স্বল্পতা আছে- এটা স্বীকার করতেই হবে।

হামের চিকিৎসায় ৫ এপ্রিল আবার ছেলেকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করেন সোহাগ ভূঁইয়া। ছেলের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান গাড়িচালক সোহাগ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউতে ৭ দিনে খরচ হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। ছেলে অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তার কাজ করা বন্ধ। খরচ জোগাচ্ছেন ঋণ করে। সোহাগ ভূঁইয়া বলেন, ‘একদম নিঃস্ব হয়ে গেছি। বুক ফাইটা যায় কারও কাছে বলতে পারি না, যারা একবার টাকা দিছে, তারা আর টাকা দিতেও চায় না।’ তিনি বলেন, দিনে ২-৩ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়, খাবার কিনে খাওয়া লাগে। সারা রাত হাসপাতালের বাইরে খোলা আকাশের নিচে থাকেন। আর টাকা নেই; কিন্তু বাবা হয়ে তো অসুস্থ বাচ্চাকে চিকিৎসা না করিয়ে বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, হামে চিকিৎসায় যে খরচ হচ্ছে, তা আর্থিক অবস্থা যাই থাকুক, পরিবারগুলোর জন্য অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে। পরিবারগুলো এক হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছে না, আরেক হাসপাতালে দৌড়াতে হচ্ছে। অন্য হাসপাতালে পিআইসিইউ পাবে তার নিশ্চয়তা নেই। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে সিন্ডিকেট কাজ করছে। এর মধ্যে রোগীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে।