স্বাধীনতা পদক

খালেদা জিয়ার মরণোত্তর পুরস্কার গ্রহণ করলেন জাইমা রহমান

যুদ্ধপরিস্থিতিতেও সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ পদক তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ বছর পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের হাতে পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রথমেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মরণোত্তর পুরস্কারটি গ্রহণ করেন তার নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তিনি ‘দাদু’র পদক গ্রহণ করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে ‘স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নারীশিক্ষাসহ দেশ গঠনে’ সার্বিক অবদানের জন্য। খালেদা জিয়াসহ মরণোত্তর এই সন্মাননা পেয়েছেন সাতজন। তাঁরা হলেন মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিল, সাহিত্যে ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সমাজসেবায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মাহেরীন চৌধুরী, সংস্কৃতিতে বশীর আহমেদ এবং জনপ্রশাসনে কাজী ফজলুর রহমান।

মেজর জলিলের পক্ষে তার কন্যা ব্যারিস্টার সারা জলিল, ড. আশরাফ সিদ্দিকীর পক্ষে তার মেয়ে তাসনিম আরিফা সিদ্দিকৗ, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পক্ষে তার ছেলে বারীশ হাসান চৌধুরী, মাহেরীন চৌধুরীর পক্ষে তাঁর স্বামী মনসুর হেলাল, বশীর আহমেদের পক্ষে তাঁর কন্যা হুমায়ারা বশীর এবং কাজী ফজলুর রহমানের পক্ষে তার কন্যা তাবাসুম শাহনাজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে অধ্যাপক জহুরুল করিম, সংস্কৃতিতে এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত), ক্রীড়ায় জোবেরা রহমান (লিনু), সমাজসেবায় সাইদুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে মোহাম্মদ আবদুল বাকী, অধ্যাপক এম এ রহিম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আবদুল মুকিত মজুমদার (মুকিত মজুমদার বাবু) প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার নেন। অধ্যাপক জহুরুল করিমের পক্ষে তার পুত্র হারুনুর রশীদ এবং এ কে এম হানিফ, জোবেরা রহমান, সাইদুল হক, মোহাম্মদ আবদুল বাকী, এম এ রহিম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, আবদুল মুকিত মজমুদার প্রত্যেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার নেন।

এ বছর যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারে মনোনীত করা হয়েছে সেগুলো হলো মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চিকিৎসাবিদ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,পল্লী উন্নয়নে পল্লী কর্মণ্ডসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), জনসেবায় এসওএস শিশু পল্লী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছে।

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল আদনান কবির, ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, পল্লী কর্মণ্ডসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান, এসওএস শিশু পল্লীর ন্যাশনাল ডাইরেক্টর এনামুল হক এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সিনিয়র প্যারামেডিক বিউটি রানী সাহা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নেন।

স্বাধীনতা পুরস্কার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতিবছর এ পুরস্কার দিয়ে আসছে। স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১৮ ক্যারেটের ৫০ গ্রামের একটি স্বর্ণপদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, তিন লাখ টাকা ও একটা সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।

যুদ্ধপরিস্থিতিতেও সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে সরকার- প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধপরিস্থির মধ্যেও আমরা সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও জনদুর্ভোগ বিবেচনায় আমরা দাম বাড়াইনি। এই খাতে প্রতি দিন শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের বিতর্ক থাকতে পারে; তবে তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। দেশের স্বার্থে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকা জরুরি। বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী চক্র কিন্তু এখনও সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পদক-২০২৬ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবার প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারীগের স্মরণ করেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবময় পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার। এটি সবচেয়ে গৌরবজনক রাষ্ট্রীয় সম্মান। শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রবর্তন করেন।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, আগামীর বাংলাদেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আপনাদের অবদান প্রেরণার উৎস্য হবে। বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে আপনাদের অবদান এবং সফল কর্মগুলো অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব দরবারেও সমাদৃত হবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।

তারেক রহমান বলেন, অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। সেই দেশটি এখন ৫৫ বছর পার করে ফেলেছে। এতো বছরে আমাদের যেমন অনেক প্রাপ্তি রয়েছে অপ্রাপ্তিও কম নয়। তাই আমাদের প্রত্যাশিত স্বনির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিশোধ প্রতিহিংসা কিংবা অযথা বিতর্ক নয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলতেন, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা’। সেই কথা স্মরণ রেখেই বলতে চাই, আমাদের মত-পথ ভিন্ন হতে পারে, বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক-বিরোধ থাকতে পারে, তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। দেশের স্বার্থে আমাদের সবার সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চক্র এখনও সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি-দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। দেশে বর্তমানে এক বিশাল সংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করাই এই মুহূর্তের বড় চ্যালেঞ্জ।

তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও বিপর্যয় নেমে আসে। ইন্টেরিম সরকারের সময়েও শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরেনি দুঃখজনকভাবে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক এবং কর্মমুখী করতেই হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার কাজটিও আমরা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছি। নারীদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের কোনও উদ্যোগই সহজে সফল হবে না। এভাবে প্রতি সেক্টরকে চিহ্নিত করে সরকার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের রায়ে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার আগেই বিস্তারিতভাবে দেশের জনগণের সামনে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছিলাম। রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা প্রকাশ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য স্বাক্ষর করেছিলাম। জনগণ আমাদের প্রতিটি অঙ্গীকারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। এবার আমাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পালা। আমরা ইতোমধ্যেই জনগণের সামনে দেয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। দলীয় ইশতেহার এবং স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা প্রতি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ। আমি বিশ্বাস করি, পুঁথিগত পরিবর্তনের চেয়ে মানসিকতার পরিবর্তন বেশি জরুরি। বিএনপি সরকার যতবার রাষ্ট্র পরিচালনা সুযোগ পেয়েছে, বারবার এর প্রমাণ দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থির মধ্যেও আমরা সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও বর্তমান সরকার দাম বাড়ায়নি। এই খাতে প্রতিদিন শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। জনগণের সুবিধা নিশ্চিত রাখতে সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কারণ, আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আমি আস্বস্ত করতে চাই, জনগণের বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। তবে রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাহুল্যবর্জন, এমনকি পারিবারিক পর্যায়েও অমিতব্যয়িতা পরিহার করতে আমি দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানাই।