মধ্যপ্রাচ্যে স্বস্তির হাওয়া হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর লেবাননের বাস্তুচ্যুত মানুষজন ধীরে ধীরে নিজ নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও বিমান হামলার কারণে যারা আশ্রয়কেন্দ্র বা অস্থায়ী শিবিরে ছিলেন, তারা এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। তবে অনেক এলাকায় ফিরে গিয়ে ধ্বংসস্তূপ ও বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশ দেখতে পাচ্ছেন বাসিন্দারা। তবুও অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও নিজ ভিটেমাটিতে ফেরার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে। যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা না হলে পুনরায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, লেবাননের যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়ে এই প্রণালী দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজ অতিক্রম করতে পারবে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ইরানের অন্যতম দাবি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ৩টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।

জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে যুদ্ধবিরতি ১০ দিন স্থায়ী হবে, তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে- এটি বাড়ানো হতে পারে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এটি লেবাননের সঙ্গে একটি ‘ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির’ সুযোগ তৈরি করবে। ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি মানতে রাজি হয়েছে, তবে তাদের দাবি- পুরো লেবাননজুড়ে হামলা বন্ধ করতে হবে এবং ইসরায়েলি বাহিনীর চলাচলের স্বাধীনতা থাকা চলবে না। নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ লেবাননের ১০ কিমি. ভেতরে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চলে’ অবস্থান করবে, যা হিজবুল্লাহর দাবির বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চুক্তি অনুযায়ী লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহর হামলা রোধে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নিতে হবে; লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষার একক দায়িত্ব থাকবে শুধু দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর। যুদ্ধবিরতি শুরুর ঠিক আগেই ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা গত ২৪ ঘণ্টায় লেবাননে হিজবুল্লাহর ৩৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে যেতে ইসরায়েল বাধ্য হয়েছে- ইরানের প্রেসিডেন্ট : লেবাননে যুদ্ধবিরতি করতে ইসরায়েলকে বাধ্য করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য এটা সম্ভব হয়েছে। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বা লেবাননের অন্যান্য ফ্রন্টগুলোতে আক্রমণ করার কোনো অধিকার লেবাননের নেই।

ইরানের মর্যাদা এবং গর্ব অক্ষুণ্ণ রেখে নিবেদিতভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান পেজেশকিয়ান। তিনি আরও বলেন- ১. ইরান পরমাণু অস্ত্র চায় না, একইসঙ্গে এই অঞ্চলে অস্থিরতা বা সন্ত্রাসবাদও চায় না। ২. তেহরান তার ভূখণ্ডের অখণ্ডতা মর্যাদার সঙ্গে এবং আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে রক্ষা করে শান্তি চায়। ৩. ইরান তার নীতিমালা এবং অবস্থানের ওপর দৃঢ় থাকবে, বিষয়টি অন্য পক্ষকে বুঝতে হবে এবং ৪. ইরানের সামরিক কমান্ডার, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী এবং ছাত্রদের হত্যার মাধ্যমে এই বৃহত্তর অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলা এবং যুদ্ধে ঠেলে দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানাল ইরান : লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত ইরান একে কূটনৈতিক সাফল্য এবং হিজবুল্লাহর ‘প্রতিরোধের’ ফল হিসেবে বর্ণনা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেছেন, তেহরান এ যুদ্ধবিরতিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে দেখছে, যা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান শুরু থেকেই বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও হিজবুল্লাহর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কালিবাফ এক্স পোস্টে লিখেছেন, এই চুক্তি ‘হিজবুল্লাহর দৃঢ়তা’ এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’র ঐক্যের ফল। ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ শব্দবন্ধটি তেহরান তার আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক বোঝাতে ব্যবহার করে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিদেশ শাখা কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি হিজবুল্লাহকে ‘বিজয়ী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই চুক্তি লেবাননের প্রতিরোধের দৃঢ় সহনশীলতা এবং ইরানের সমর্থনের ফলাফল।

লেবাননের জন্য ‘ঐতিহাসিক’ দিন- ট্রাম্প : যুদ্ধবিরতিকে লেবাননের জন্য ‘ঐতিহাসিক দিন’ বলে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এক পোস্টে বলেছেন, ভালো কিছু ঘটছে। এর আগের একটি পোস্টে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, হিজবুল্লাহ এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সংযত আচরণ করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ লেবাননের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

নিজের প্লাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশালে’ তিনি লিখেছেন, আমি আশা করি এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হিজবুল্লাহ ভালো ও সুন্দর আচরণ করবে। যদি তারা তা করে, তবে এটি তাদের জন্য একটি দারুণ মুহূর্ত হবে। আর কোনো হত্যা নয়। এবার অবশ্যই শান্তি আসতে হবে! ইসরায়েলি একজন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালীনইসরায়েল শুধু হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ‘আসন্ন হুমকি’ মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপ নেবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ প্রয়োজন।

ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে ‘ট্রিগারে আঙুল রাখবেন’ হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা : ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ‘ট্রিগারে আঙুল রাখবেন’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি। লেবাননের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ- নিয়ন্ত্রিত আল-মানার টেলিভিশনে প্রচারিত ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ বলে, মুজাহিদিনেরা ট্রিগারে আঙুল রাখবেন। তারা শত্রুর বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।

পারস্য উপসাগর ছেড়েছে ইরানের তেলবোঝাই ৩ ট্যাঙ্কার : মার্কিন বাহিনী অবরোধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ইরানের তেলবোঝাই তিনটি ট্যাঙ্কারের পারস্য উপসাগর ত্যাগ করার তথ্য দিয়েছে কেপলার। সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘ডিপ সি’, ‘সোনিয়া ১’ এবং ‘ডিওনা’ নামে তিনটি জাহাজে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। তেহরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার লক্ষ্যে গত সোমবার ইরানর বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ শুরু করে মার্কিন বাহিনী। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ গত ১০ এপ্রিল ‘স্টারলা’ নামে একটি জাহাজ পারস্য উপসাগর ত্যাগ করে।