দাম বাড়ল, তবুও কাটেনি জ্বালানি সংকট
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই- সরকারের এমন দাবি বারবার শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে চিত্র ভিন্ন। দাম বাড়ানোর পরও রোববার দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে গাড়ির ব্যাপক চাপ দেখা গেছে। রাজধানীর সড়কে নেমে পড়েছেন কর্মীজীবী মানুষেরা। একদল যখন কর্মক্ষেত্রে ছুটতে ব্যস্ত ঠিক তখনই ভিন্ন চিত্র দেখা যায় রাজধানীর তেল পাম্পগুলোতে। একের পর এক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পাম্পে তেলের অপেক্ষায় অলস সময় কাটাতে ব্যস্ত যানবাহন চালকরা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে অস্থির গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার। বাংলাদেশেও গত দেড় মাস ধরে জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে সংকট। এতদিন জেট ফুয়েল ছাড়া অন্য জ্বালানির দাম না বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
মন্ত্রণালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বেড়েছে।
তেলের পাশাপাশি এলপিজির দামে লাফ এক লাফে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২১২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরদিনই রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম এক ধাক্কায় বাড়ল প্রতি কেজিতে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) রোববার এক আদেশে বলেছে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে এপ্রিল মাসের জন্য অন্তর্বর্তী এ দর ঠিক করা হয়েছে। এদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দর কার্যকর হবে। এর আগে গত ২ এপ্রিল ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে আরও ২১২ টাকা বেড়ে যাওয়ায় এক মাসেরও কম সময়ে এই সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৫৯৯ টাকা। তখন সৌদি আরামকোর ঘোষিত সিপি, জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম বিবেচনায় এলপিজির দাম সমন্বয় করার কথা জানিয়েছিল বিইআরসি। তখন প্রতি টনে জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম ধরা হয়েছিল প্রতি মেট্রিক টনে ১২০ মার্কিন ডলার। এখন সেই প্রিমিয়াম ২৫০ ডলার ধরে চলতি মাসের অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য বেসরকারি এলপিজি ও অটোগ্যাসের নতুন দর ঠিক করার কথা জানিয়েছে বিইআরসি। কমিশন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংকট, ওই অঞ্চলে এলপিজিবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিকল্প পথে এলপিজি আনতে হওয়ায় সময় ও জ্বালানি খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি বিমা ও নিরাপত্তা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এলপিজি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দর সমন্বয় করা হয়েছে।
খুচরা পর্যায়ে বেসরকারি এলপিজির মূসকসহ প্রতি কেজির দাম ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে এপ্রিলের জন্য ১৬১ টাকা ৬৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে তিন সপ্তাহর মধ্যে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। গত ২ এপ্রিল ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,৮০১ টাকা। ১৯ এপ্রিলে তা বেড়ে ২০২১ টাকা করা হয়েছে। আর ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭৯২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৮৯ টাকা।
বড় সিলিন্ডারগুলোর দামও একই হারে বেড়েছে। ১৫ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ১৬১ টাকা থেকে ২ হাজার ৪২৫ টাকা, ১৬ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০৫ টাকা থেকে ২ হাজার ৫৮৭ টাকা, ১৮ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৫৯৩ টাকা থেকে ২ হাজার ৯১০ টাকা এবং ২০ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৮৮১ টাকা থেকে ৩ হাজার ২৩৩ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২২ কেজির সিলিন্ডার ৩ হাজার ১৬৯ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫৫৭ টাকা, ২৫ কেজির সিলিন্ডার ৩ হাজার ৬০১ টাকা থেকে ৪ হাজার ৪২ টাকা, ৩০ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ৩২১ টাকা থেকে ৪ হাজার ৮৫০ টাকা, ৩৩ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ৭৫৩ টাকা থেকে ৫ হাজার ৩৩৫ টাকা, ৩৫ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ৭৫৩ টাকা থেকে ৫ হাজার ৬৫৮ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার ৬ হাজার ৪৮২ টাকা থেকে ৭ হাজার ২৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে সরবরাহ করা বেসরকারি এলপিজির দামও বেড়েছে। তরল অবস্থায় প্রতি কেজির দাম ১৪০ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫৭ টাকা ৯১ পয়সা করা হয়েছে। গ্যাসীয় অবস্থায় প্রতি ঘনমিটারের দাম ৩১১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৫১ টাকা হয়েছে। আর প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়েছে। এপ্রিলের জন্য প্রোপেনের সৌদি সিপি প্রতি টন ৭৫০ ডলার এবং বিউটেনের ৮০০ ডলার নির্ধারণ করা রয়েছে। ওই দুই গ্যাস ৩৫:৬৫ অনুপাতে মিশিয়ে এলপিজি হয়। তাতে গড় সৌদি সিপি দাঁড়িয়েছে ৭৮২ দশমিক ৫০ ডলার, যা মার্চে ছিল ৫৪১ দশমিক ৭৫ ডলার।
বিইআরসি বলেছে, এলপিজি মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ লাইসেন্সধারীরা বোতলজাতকরণের পর নির্ধারিত মূল্যে ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে এলপিজি বিক্রি করবে এবং সেই অনুযায়ী মূসক চালান বা ডেলিভারি অর্ডার দিতে হবে। কোনো পর্যায়ে (এলপিজি মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ভোক্তাপর্যায়ে রিটেইলার পয়েন্টে) কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে এলপিজি-অটোগ্যাস বিক্রয় করা যাবে না।
দেশে ভোক্তাপর্যায়ে বিক্রয়মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে গত শনিবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের নতুন দাম গতকাল মধ্যরাত থেকেই কার্যকর হয়েছে। রোববার থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও প্রতিদিনের মতো সকাল থেকেই পাম্পগুলোতে তেল সংগ্রহে আসা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ঢাকার প্রবেশমুখে রাজধানী ফিলিং স্টেশন, আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন এবং মেঘনা ফিলিং স্টেশন ঘুরে যানবাহনের এমন দীর্ঘসারি দেখা গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর এই তিনটি তেল পাম্পের সামনেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে এত সকালে কোনো পাম্পে তেল বিক্রি শুরু না হলেও লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন যানবাহন চালকরা। অপেক্ষা করেন তেলের জন্য। পাম্পে অপেক্ষারত যানবাহন চালকদের ভাষ্য, গতকাল (শনিবার) রাত থেকেই তারা তেল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছেন। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে তেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শাহীন বলেন, গতকাল (শনিবার) সন্ধায় এসে দাঁড়িয়েছি। রাত ১১ টা পর্যন্ত পাম্প থেকে তেল দিয়েছে। তারপর তেল শেষ হয়ে গেছে। রোববার আবার তেল দেওয়া শুরু হলে তেল নিয়ে তারপর বাসায় যাব। হাফিজ নামের অন্য একজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, শনিবার দুপুর ৩টার সময় লাইনে দাঁড়িয়েছি। যখন লাইনে দাঁড়িয়েছি তখন লাইনের শেষ মাথা ছিল টাউনহল পর্যন্ত। পরে টাউনহল থেকে আসাদগেট পর্যন্ত আসতে আসতেই তেল শেষ। রাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনও পাম্প খোলেনি।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় পাম্পগুলোতে যানবাহন চালকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে সরকারের তেলের দাম বাড়ানো সঠিক সিদ্ধান্ত। আবার কেউ কেউ বলছেন সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে মূলত সিন্ডিকেট ভাঙতে, পাম্পগুলোতে যেন ভিড় কমানো যায়। কিন্তু সরকার তেলের দাম না বাড়িয়ে যদি সব বন্ধ হয়ে যাওয়া পাম্পে তেল বিক্রির ব্যবস্থা করত, তাহলে গ্রাহকদের ভিড় কমে যেত। রাজধানীর মগবাজার থেকে তেল নিতে পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে এসে লাইনের শেষের দিকে দাঁড়িয়ে আছেন মেজবা উদ্দিন। তিনি বলেন, সকাল ৭টার সময় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এত পেছনে। কাল রাত থেকেই সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে। সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। ভাবছিলাম আজ হয়তো লাইন কমবে কিন্তু আগের মতোই আছে।
তিনি বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে যেন সিন্ডিকেট ভাঙা যায়। পাম্পগুলোতে যেন চাপ কমে। পাম্পের চাপ কমাতে, দাম বাড়লে হবে না। যার তেল প্রয়োজন তাকে তেল নিতেই হবে। পাম্পের এই চাপ কমাতে হলে সরকারের উচিত বন্ধ হয়ে যাওয়া সব পাম্পে তেল দেওয়া চালু করা। তাহলে পাম্পের চাপ কমবে। অথচ সরকার বলছে তেল পর্যাপ্ত আছে। তেল পর্যাপ্ত আছে তাহলে পাম্প বন্ধ কেন? তেল পর্যাপ্ত আছে তাহলে দাম বাড়ল কেন? মানুষ কেন তেল মজুত করছে? কারণ সরকার তেল দিতে পারছে না। পাম্পগুলো বন্ধ থাকছে। এজন্য তেল পর্যাপ্ত মজুত আছে বললেও মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না। যার কারণে মানুষ অবৈধভাবে তেল মজুত করছে। আবার ভিন্ন কথা বলছেন কিছু যানবাহন চালক। তাদের ভাষ্য- সরকারের তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে পাম্প মালিক ও সাধারণ মজুতদাররা সিন্ডিকেট করতে পারবে না। ফলে তেল পাম্পগুলোতে ভিড় কমবে। তেলের লাইনে অপেক্ষারত সাইফুল নামের এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, কাল রাত ১১টার দিকে এসে দাঁড়িয়েছি। এখনও তেল পাইনি।
তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই- অর্থমন্ত্রী : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কোনো শর্তের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আইএমএফের চাপে নয়, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সরকারি তহবিলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দাম বাড়ানো হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত নির্বাচিত সরকার মেনে নেবে না। ভবিষ্যৎ কর্মসূচির বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় যোগদান শেষে গতকাল রোববার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৮ এপ্রিল এ সভা শেষ হয়।
জ্বালানি তেলের দাম আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে বাড়ানো হলো- কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সারা দুনিয়ায় তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তাদের কথা মাথায় রেখে এত দিন দাম বাড়ানো হয়নি। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সবাই বলছে, আপনারা তেলের দাম বাড়াচ্ছেন না কেন? আপনার তো তহবিল খালি হয়ে যাচ্ছে। তেলের দাম না বাড়ালে দেশ চালাবেন কী করে? সে জন্য যতটুকু না বাড়ালে নয়, ততটাই বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে আইএমএফ শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই।’
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, না-ও বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম যতটুকু বেড়েছে তা বেশি নয়। মূল্যস্ফীতির ঝুড়িতে জ্বালানি তেলের অংশ সামান্য।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলমান প্রক্রিয়া, এটি চলতে থাকবে। আলোচনা এখনও শেষ হয়নি। উন্নয়ন সহযোগীদের চাওয়া আছে, বাংলাদেশেরও চাওয়া-পাওয়া আছে। তারা চাইলেই তাদের কথামতো করতে পারব না। কারণ, আমরা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার।’
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অনেক বিষয়ে সরকার জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের বাইরে গিয়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে কোনো কিছু নেব না। এটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ব্যাপার।’
অর্থমন্ত্রী জানান, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা আরও ১৫-২০ দিন চলতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে মোটামুটি আলোচনা হয়ে গেছে, শেষের দিকে। এডিবি, এআইআইবি ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়ে গেছে। আইএমএফের সঙ্গে যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের জনগণ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এমন সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারবে না। শুধু ওদের সিদ্ধান্তের ব্যাপার নয়, বাংলাদেশেরও সিদ্ধান্তের ব্যাপার আছে।
কিছু শর্ত বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে : আইএমএফের শর্ত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, আইএমএফের সঙ্গে ঋণ কর্মসূচি আওয়ামী লীগের সময়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে অনেক শর্ত আছে, কিছু শর্ত বিএনপি সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য না–ও হতে পারে। আওয়ামী লীগ ছিল অনির্বাচিত সরকার, বিএনপি নির্বাচিত সরকার। আইএমএফের কোনো শর্ত যদি জনগণের কোনো ধরনের স্বার্থ সংরক্ষণে বাধা হয়, সে সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকার নেবে না।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আইএমএফের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যে প্রোগ্রাম, সেটি ছয়-সাতটি মাস পর শেষ হয়ে যাবে। পরবর্তী সময়ে প্রোগ্রামে যাওয়া হবে কি না, সেটি এই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। ফ্যামিলি কার্ড চালু করার কারণে আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে যেতে পারে, অথবা ঋণ ছাড় করার কারণে নতুন শর্ত আরোপ করছে এমন আলোচনা উঠেছে- এক সাংবাদিকের এমন মন্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে আইএমএফের ঋণের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং ফ্যামিলি কার্ডকে সব পক্ষ প্রশংসা করেছে। অর্থনীতির সুফল দরিদ্র জনগণের কাছে এর মাধ্যমে পৌঁছে যাবে।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জনগণের কল্যাণকে বাইরে রেখে কোনো দাতা সংস্থার শর্তপূরণের সুযোগ নেই। ফ্যামিলি কার্ড সব উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অত্যন্ত ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে।
পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি হচ্ছে- সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের মজুত ও কালোবাজারি করছে। ফলে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি হচ্ছে। রোববার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
‘দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই’ - সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের এমন বক্তব্য যথার্থ বলে মন্তব্য করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকার গত বছরের মার্চে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে, চলতি বছরের মার্চে একই পরিমাণ তেল সরবরাহ করেছে। ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন থেকে মোটরবাইকে ২০০ টাকার ফুয়েল প্রদান বা রং লাগানোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে ‘প্যানিক বায়িং’ ও মজুতপ্রবণতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
