কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবেছে চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বর্ষণে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্দরনগরীর আকাশ ছিল মেঘলা। বেলা ১০টার পর গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয় এবং বেলা ১১টার দিকে ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়। এরপর দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত টানা মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়।

বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে পানি জমতে শুরু করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা দেখা যায় গোলপাহাড় মোড় থেকে প্রবর্তক মোড় হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সামনের সড়ক পর্যন্ত। দুপুর ১টার দিকে বদনা শাহ মাজার সংলগ্ন এলাকায় কোমর থেকে বুকসমান পানি জমে যায়। ওই সড়কে তীব্র ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল করতে দেখা গেছে। মাজার সংলগ্ন নার্সিং কলেজ সড়কও পানিতে তলিয়ে যায়। বিপরীত পাশের সিএসসিআর ও সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ একাধিক বেসরকারি ক্লিনিকে আসা রোগীরা পানিতে আটকা পড়েন। এর আগে গত সোমবার বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতেও এই অংশটি ডুবে গিয়েছিল।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সড়কের ওই অংশে গিয়ে দেখা যায়, পানিতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে কয়েকটি অটোরিকশা আটকা পড়েছে। সড়কের এক পাশে রাখা একটি প্রাইভেট কার ও তিনটি মোটর সাইকেল অর্ধেকের বেশি পানিতে ডুবে গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা সামিউল হক। প্রবর্তক মোড়ে পৌঁছানোর আগেই তিনি পানিতে আটকা পড়েন। তিনি বলেন, “এখানে মেডিকেল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে। এই সড়কে বারবার পানি ওঠে। সামনে বর্ষা আসছে, তার আগে খালের এই অংশটি কীভাবে পরিষ্কার রাখা যায়, সেটা কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত ছিল।”

প্রবর্তক মোড়ের অদূরে হিজড়া খালের পাঁচলাইশ অংশে সংস্কারকাজ চলমান থাকায় সেখানে খালের ভেতর মাটি দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবারের ভারি বৃষ্টিতে ওই এলাকায় খাল ও সড়ক একাকার হয়ে যায়। কাতালগঞ্জেও খালের কালভার্ট সংস্কারের কারণে গত দুই মাস ধরে সড়কের একপাশ বন্ধ রয়েছে, সেখানেও পানি জমেছে।

এছাড়া মুরাদপুর এন মোহাম্মদ অংশে খালের পানি উপচে মূল সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। এতে ওই সড়কে যানবাহনের ধীরগতি এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নগরীর বহদ্দারহাট, তিন পোলের মাথা, জামালখানের প্রচ্ছদ গলি ও রহমতগঞ্জ এলাকায়ও পানি জমে যায়।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) উপ-প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা বলেন, “এসব জায়গায় কোথায় কী সমস্যা আছে সেটা আমরা দেখছি। খালে বাঁধ যেখানে আছে, সেসব স্থানে মাত্র একটি করে পাইপ দেওয়া আছে পানি যাবার জন্য। অথচ খালের প্রস্থ ২০ ফুট। ভারি বৃষ্টিতে এত পানি একটা পাইপ দিয়ে সরা সম্ভব না।” বেলা আড়াইটার দিকে প্রবর্তক মোড় ও চমেক এলাকা পরিদর্শন করেন সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন।

পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “যেখানে যেখানে সমস্যা আছে সেটা আমি দেখতে সরেজমিন এখানে এসেছি। ইতোমধ্যে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, গোসাইলডাঙা, সিডিএ, আগ্রাবাদ, চকবাজার, ফুলতলি ঘুরে এখানে এসেছি। আমি মনিটরিং এর মধ্যে আছি। “একটা কর্মযজ্ঞ চলছে আসলে। গতবছর বর্ষাতে আমরা জলাবদ্ধতা কমিয়ে দিতে পেরেছিলাম। এবারেও আশাবাদী, হিজড়া খালের কাজ যদি ১৫ মে এর মধ্যে শেষ করতে পারি তাহলে জলাবদ্ধতা কমাতে পারব।” প্রবর্তক মোড় ও আশেপাশের এলাকায় হিজড়া খালের কাজ সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড করছে জানিয়ে মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকল্পের অধীনে হিজড়া খাল, জামালখান খাল এবং মুরাদপুরের যে অংশ সেখানে কাজ এখনো শেষ হয়নি। “হিজড়া খালের প্রবর্তক, পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জের অংশে কাজ চলছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দেওয়ার কারণে চকবাজার, প্রবর্তক ও মেডিকেলের সামনে পানি উঠেছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে তারা রিটেইনিং ওয়ালের কাজ করছে। তারা আমাদের বলেছে ১৫ মে এর মধ্যে বুঝিয়ে দিতে পারবে।”

পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয় জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৬ মিলিমিটার। এদিকে দেশের আট বিভাগেই কালবৈশাখী ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। অতি ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে গত সপ্তাহ থেকে নগরীতে মাসব্যাপী নালা-খাল পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। অন্যদিকে, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল সংস্কারের কাজ করছে সিডিএ, যার বেশিরভাগ শেষ হলেও হিজড়া ও জামালখান খালের কাজ এখনো চলমান।

দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতেই কুমিল্লা শহরে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে নগরবাসী: কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দেড় ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পানিতে ডুবে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা। শহরের রেসকোর্স এলাকার প্রধান সড়ক, জেলা জজ আদালতের সামনের রাস্তা, ঝাউতলা সড়ক এবং টমছমব্রিজ এলাকার নিউ হোস্টেলসংলগ্ন সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। জলমগ্ন সড়ক পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে বিপাকে পড়েন পথচারীরা।

জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় কুমিল্লায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার ড্রেনের ময়লা-আবর্জনাও সড়কে উঠে আসে। এতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। ঝাউতলা এলাকার ব্যবসায়ী আনোয়ার বলেন, ড্রেন পরিষ্কার না থাকায় বৃষ্টির পানি ঠিকমতো নামতে পারছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যাচ্ছে।

একই অভিযোগ করেন জেলার সংস্কৃতিকর্মী খাইরুল আজিম শিমুল। তিনি বলেন, নাগরিকদের অসচেতনতার কারণেও এই দুর্ভোগ বাড়ছে। নালা-নর্দমায় আবর্জনা, ডাবের খোসা ও প্লাস্টিকের বোতল ফেলার কারণে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়ার্ডভিত্তিক শ্রমিক নিয়োজিত করা হয়েছে। যেখানে পানি জমছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অতিবৃষ্টিতে হাওরে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান : কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার উৎসব চলছিল পুরোদমে। কিন্তু সেই আনন্দে হঠাৎই ছন্দপতন ঘটিয়েছে টানা অতিবৃষ্টি। গত তিনদিনের ভারী বর্ষণে হাওরের নিম্নাঞ্চলে পানি জমে গেছে। বিশেষ করে জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে খোয়াই নদীর পানি ঢুকে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধানক্ষেত। ফলে কৃষকের স্বপ্নের সোনালী ফসল এখন ডুবে যাচ্ছে পানির নিচে।

অতিবৃষ্টির কারণে শুধু জমিই নয়, ধান শুকানোর খলাতেও পানি জমেছে। এতে ধান মাড়াই ও সংরক্ষণেও দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি। নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন সোমবার ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। বুধবারও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে জেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় নিম্নাঞ্চলের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় পানি নামেনি, বরং কোথাও কোথাও আরও বাড়ছে। অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ইটনা, মিঠামইন, নিকলী, তাড়াইল, করিমগঞ্জ ও বাজিতপুরের হাওর এলাকাতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জমিতে পানি বেড়ে যাওয়ায় যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। এ বছর জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ টন, যার বড় অংশই আসার কথা হাওর অঞ্চল থেকে। এখন পর্যন্ত কৃষকেরা হাওরাঞ্চলের ৫০ পার্সেন্ট বোরোধান কাটতে পেরেছে।

অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকার কৃষক ফুল মিয়া বলেন, অতিবৃষ্টিতে আমাদের এলাকার শত শত একর ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। অনেক জমিতে পানি বেড়ে যাওয়ায় মেশিন দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। চোখের সামনে কষ্টের ফসল ডুবে যাচ্ছে, আমরা অসহায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিকেলের মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকায় খোয়াই নদীর পানি ঢুকে পাকা ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। গতকাল পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছিল। এদিকে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, এখনো হাওরের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে টানা বৃষ্টিতে পানি বাড়ছে। আগাম বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কৃষকরা কেটে ঘরে তুলতে সেইজন্য আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া ছিল।