দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা

সন্দেহভাজন খুনির জামিন হয়নি, অপরাধ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে

* লিমনের লাশ ফিউনারেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর, দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে * আদালতে হাজির নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লিমন-বৃষ্টির বন্ধুরা কে কী বলেছেন

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির খুনি সন্দেহে গ্রেপ্তার হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে বন্দি করে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত মঙ্গলবার হিলসবরো কাউন্টির একটি আদালতের বিচারক লোগান মারফি এ আদেশ দেন। এদিনের সংক্ষিপ্ত শুনানিতে বিচারক মারফি আসামি আবুঘরবেহকে সাক্ষী বা ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার নির্দেশও দিয়েছেন।

টাম্পা বে ২৮-এর প্রতিনিধি জাডা উইলিয়ামস গত মঙ্গলবার শুনানি চলাকালে আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের টাম্পা ক্যাম্পাসেও গিয়েছিলেন। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দুই সহপাঠীকে এভাবে হারানোর দুঃখে এখনও শোকাচ্ছন্ন। ক্যাম্পাসের বাইরে বাসাভাড়া করে থাকা নিয়েও তারা চরম নিরাপত্তা উদ্বেগে ভুগছেন।

আদালতের নথি অনুযায়ী, আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যা, অস্ত্র রাখার অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, তবে আবুঘরবেহর সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) চাইবেন কি না, প্রসিকিউটররা তা এখনও জানাননি। গত মঙ্গলবার সকালে হওয়া এ শুনানির সময় আবুঘরবেহ আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। পাবলিক ডিফেন্ডার জেনিফার স্প্র্যাডলি আগের দিন সোমবারই বলে দিয়েছিলেন, তার দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না।

লিমনের মরদেহ ফিউনারেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর, দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে : যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় হত্যার শিকার বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের লাশ গতকাল মঙ্গলবার টাম্পা ফিউনারেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ কমিউনিটির সঙ্গে আলোচনা ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সঙ্গে সমন্বয় করে মায়ামির বাংলাদেশ কনস্যুলেট ফিউনারেল কর্তৃপক্ষের কাছে লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, লাশ হস্তান্তরের আগে মায়ামির বাংলাদেশ কনস্যুলেট জামিল আহমেদ লিমনের পরিবারের সম্মতি নিয়েছে। মরদেহের পরবর্তী সব প্রক্রিয়া মুসলিম রীতিতে সম্পন্ন হবে।

জামিল আহমেদ লিমনের লাশ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও দুই-এক দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।

১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন (২৭) ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৭) নিখোঁজ হন। পরদিন তাদের এক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন।

এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে তার পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে বলা হয়, আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কয়েকটি কালো রঙের আবর্জনা ফেলার ব্যাগের মধ্যে লিমনের ক্ষতবিক্ষত লাশ খুঁজে পাওয়া যায়।

আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের লাশের কোনো কাপড় ছিল না এবং লাশে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তার কাছ থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিহত আরেক শিক্ষার্থী বৃষ্টির লাশ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে যেখানে লিমনের লাশ পাওয়া গেছে, সেখান থেকে কিছুটা দূরে একটি জলাশয়ে ২৬ এপ্রিল একটি লাশের খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে। সেটি বৃষ্টির কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

আদালতে হাজির নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লিমন-বৃষ্টির বন্ধুরা কে কী বলেছেন : ‘আমরা বাংলাদেশিরা এখানে একটি পরিবারের মতো বসবাস করি। আমরা একসঙ্গে খাবার খাই, একসঙ্গে বেড়াতে যাই, ঘুরতে যাই’- হিশাম আবুঘরবেহর জামিন শুনানির দিন আদালতকক্ষে উপস্থিত জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির বন্ধু আবীর আল হাসিব সৌরভ এভাবেই ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বন্ধনের কথা বললেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

১৬ এপ্রিল টাম্পা বে এলাকায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই শিক্ষার্থী লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হন। পরদিন বৃষ্টির একজন বন্ধু তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানান।

গত শুক্রবার লিমনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে লিমন খুন হয়েছেন বলে জানানো হয়। বৃষ্টির মরদেহের বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের এক মার্কিন তরুণকে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৪ বছর বয়সী হিশাম আর লিমন সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাইরে একই অ্যাপার্টমেন্টের একটি কক্ষে শেয়ারে ভাড়া থাকতেন।

হিশামের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির দুটি হত্যার অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার হিলসবরো কাউন্টির একটি আদালত আবুঘরবেহকে জামিন না দিয়ে কারাবন্দি করে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিন সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশিদের একটি দল আদালতে উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই লিমন ও বৃষ্টির সহপাঠী ও বন্ধু।

তাদের একজন সালমান সাদিক শুভ বলেন, ‘আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে, সেটা আমরা জানতে চাই।’ জামিল ও বৃষ্টি হাত্যাকাণ্ড নিয়ে চলমান মামলার বিষয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন জানিয়ে সালমান আরও বলেন, ‘আমরা নিজেদের দায়িত্বশীল মনে করি, আমাদের খুব ঘনিষ্ঠভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত বলে মনে করি। আমাদের অন্য বন্ধুরা আছে, অন্যান্য মানুষও আছে, যারা লিমন ও বৃষ্টিকে ভালোবাসে এবং তাদের হত্যা মামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এখানে আমরা যা দেখছি, পর্যবেক্ষণ করছি, তাদের তা জানাতে চাই।’

রিফাতুল ইসলাম নামের আরেক তরুণ বলেন, ‘এখনও অনেক প্রক্রিয়া বাকি। দেখুন, আমরা যখন এখানে আসি, বাড়ি থেকে ৮ হাজার মাইল দূর থেকে- এখানে তারাই আমাদের পরিবার, আমাদের সবকিছু। সব অনুষ্ঠানে আমরা সবাই সবার সঙ্গে দেখা করি।’

রিফাতুল আরও বলেন, ‘আমরা এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। যে জায়গাকে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলে মনে করি- আমাদের বাড়ি, আমাদের নিজের ঘর, আমাদের নিজের রান্নাঘর- সেখানেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। এটা আমাদের খুবই হতবাক করেছে। আমি বুঝতে পারছি না কী বলব, এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’ স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ আদালতে লিমন ও বৃষ্টির বন্ধু এবং সহপাঠীদের এমন সরব উপস্থিতির বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন।

লোপেজ বলেন, ‘আমি ভাবতেও পারিনি, তাদের এত বন্ধু আসবেন। তবে আমরা ভেবেছিলাম, তাদের পরিবারের একজন সদস্য উপস্থিতি থাকবেন।’