অবরোধ ভেঙেছে আরও ৫২ ইরানি জাহাজ

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের ৫২টি জাহাজ দেশটির জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অবরোধ ভেঙেছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি। জাহাজগুলোর মধ্যে ৩১টি তেলবাহী ট্যাংকার ও ২১টি পণ্যবাহী জাহাজ। স্থানীয় সময় গত সোমবার রাত ১০টা পর্যন্ত আগের তিন দিনের স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং তথ্যের বরাত দিয়ে এ খবর জানানো হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ২ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ঘোষণা দেয়, হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনায় কোনো চুক্তি হয়নি। পরে ২১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছে; যা ইরানের আলোচনার প্রস্তাব পেশ করা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

শত্রুপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিলে রণক্ষেত্রে কঠিন জবাব পাবে- ইরানের সেনাবাহিনী : ইরানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটির জন্য পরিস্থিতি এখনও ‘যুদ্ধকালীন’ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের জন্য পরিস্থিতি এখনও যুদ্ধকালীন। আমাদের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে।’ শত্রুপক্ষকে সতর্ক করে দিয়ে ওই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘শত্রু যদি নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের সম্পূর্ণ নতুন ধরনের সরঞ্জাম, পদ্ধতি ও রণক্ষেত্রে কঠিন জবাবের মুখোমুখি হতে হবে।’

৫৭ দিন পর সচল হলো ইরানের প্রধান বিমানবন্দর, শুরু ফ্লাইট চলাচল : দীর্ঘ ৫৭ দিন বন্ধ থাকার পর ইরানের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ‘ইমাম খোমেনি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’ আবার সচল হয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইরানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় রাজধানী তেহরানের এ প্রধান প্রবেশপথটি দীর্ঘদিন অচল ছিল। তবে দুই দিন আগে আকাশসীমা খুলে দেওয়ার পর আবার ফ্লাইট শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি ফ্লাইট পরিচালিত হলেও বর্তমানে তা ১০ থেকে ১৫টিতে নেমেছে। তবে ধীরে ধীরে কার্যক্রম বাড়ছে এবং টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের ভিড় ফিরতে শুরু করেছে। দেশজুড়ে অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই এ বিমানবন্দর সচল করা হয়েছে। তেহরানের দ্বিতীয় বিমানবন্দর ‘মেহরাবাদ’ যুদ্ধে বারবার হামলার শিকার হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবহৃত হয় এ বিমানবন্দর। এছাড়া তাবরিজ ও উর্মিয়ার মতো দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। দীর্ঘ কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধে বেশ কিছু যাত্রীবাহী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইরানের বিমান খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। বিমানবন্দরে আসা যাত্রীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরলেও ইরানে মানুষের মনে রয়েছে শঙ্কা। যুদ্ধবিরতি এখন পর্যন্ত কার্যকর থাকলেও স্থায়ী শান্তি আসবে, নাকি আবারও সংঘাত শুরু হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন।

ভদ্রতার দিন শেষ, রাইফেল হাতে ইরানকে হুমকি ট্রাম্পের : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া একটি কড়া বার্তা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, আর কোনো ভদ্রতা নয়! এই বার্তার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তেহরানের প্রতি ওয়াশিংটনের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। ট্রাম্পের এই বার্তায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইরান একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আলোচনার সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে তিনি তেহরানকে একটি সুষ্ঠু ও যুক্তিসঙ্গত চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তবে সেটি প্রত্যাখ্যান করলে ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন।

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর মতপার্থক্য ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। রয়টার্স জানায়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই আলোচনা অত্যন্ত জটিল মোড় নিয়েছে। একদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন যে ইরান আলোচনার জন্য নতুন পথ খুঁজছে, অন্যদিকে তেহরান প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের দেওয়া অনেক বক্তব্যই নাকচ করে দিচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন বেশ সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’র নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং কূটনীতিকরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘নো মোর মিস্টার নাইস গাই’ বার্তাটি কেবল একটি রাজনৈতিক হুমকি নাকি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপের পূর্বাভাস, তা আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে। তবে প্রথাগত কূটনৈতিক ভাষা এড়িয়ে সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ট্রাম্পের এই কড়া বার্তা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের ইরান কৌশলকে আবারও সবার নজরে নিয়ে এসেছে।

ইরানের নৌ-অবরোধ ‘দীর্ঘায়িত করতে’ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ ট্রাম্পের, বাড়ছে তেলের দাম : ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের মেয়াদ আরও বাড়তে পারে- এমন খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সহযোগীদের অবরোধ দীর্ঘায়িত করার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার শেষ দিকে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ইরানের অর্থনীতি ও তেল রপ্তানির ওপর চাপ বজায় রাখতে দেশটির বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। এ খবরের পর গতকাল বুধবার সকালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নতুন করে বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম টানা আট দিন ধরে বাড়ছে। জুন মাসের সরবরাহের জন্য এ তেলের দাম ৫২ সেন্ট বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১১ দশমিক ৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। জুনের চুক্তির মেয়াদ এ সপ্তাহে শেষ হওয়ায় জুলাই মাসের সরবরাহের আগাম দামও ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১০৪ দশমিক ৮৪ ডলার হয়েছে। অন্যদিকে, ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫৭ সেন্ট বা ০ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে ১০০ দশমিক ৫০ ডলারে উঠেছে। গত আট কার্যদিবসের মধ্যে সাত দিনই এ তেলের দাম বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না।

হরমুজ প্রণালী অবরোধ : পানামা খালে ভিড়ছে জাহাজ, গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ : ইরান পরিস্থিতির কারণে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা পানামা খালে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পানামা খাল কর্তৃপক্ষের অর্থ বিভাগের প্রধান ভিক্টর ভিয়াল জানান, গত বছরের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০০টি অতিরিক্ত জাহাজ এই জলপথ পাড়ি দিয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সভায় ভিক্টর ভিয়াল বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা মনে করছি।’ মূলত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের উপকূলীয় এ জলপথ এড়িয়ে চলতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো তাদের পথ পরিবর্তন করছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে পণ্য কেনাকাটায় জাহাজগুলো এখন বিকল্প হিসেবে পানামা খাল ব্যবহার করছে। এ খাল পার হতে জাহাজভেদে গড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ ডলার খরচ হয়। তবে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বলেছে, দ্রুত পারাপার নিশ্চিত করতে কোনো কোনো জাহাজকে বাড়তি ফি হিসেবে ৪ লাখ ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।