যুদ্ধবিরতির মধ্যে হামলার নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু ঠিক করছে ইরান
* ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রক্ষা করা হবে : খামেনি * যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধে তেল সরবরাহ করছে তেহরান * যুদ্ধবিরতি নিয়ে পুতিন ও ট্রাম্পের ফোনালাপ * ইরান যুদ্ধে এরইমধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে যুক্তরাষ্ট্র : পেন্টাগন * ইরানের বিরুদ্ধে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র চায় মার্কিন বাহিনী * লেবাননে ইসরায়েলের ‘হার্মিস ৪৫০ জেড’ ড্রোন ভূপাতিত
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক
যুদ্ধবিরতির মধ্যে হামলার নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু ঠিক করেছে ইরান: ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ থাকার সময়কালে ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের লক্ষ্যবস্তুর তথ্যভান্ডার হালনাগাদ ও পুরোপুরি সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে সামরিক সরঞ্জামের মানোন্নয়ন করেছে। ইরান পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে মঙ্গলবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, সেনাবাহিনী এই যুদ্ধকে শেষ বলে মনে করছে না।
ব্রিগেডিয়ার আকরামিনিয়া বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যখনই লড়াই থেমেছে ও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তখনই শত্রুপক্ষের ওপর অনাস্থার কারণে সেনাবাহিনী তাদের লক্ষ্যগুলো হালনাগাদ করা, লক্ষ্যবস্তুর তালিকা সম্পূর্ণ করা, প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা এবং যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছে। এই সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, সেনাবাহিনী তাদের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ও মানোন্নয়ন উভয় কাজই করেছে এবং ইরানের জন্য পরিস্থিতি মূলত এখনো যুদ্ধকালীন অবস্থার মতোই রয়ে গেছে।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, বাহিনীর নজরদারি, পর্যবেক্ষণ ও সরঞ্জাম সজ্জিত করার কার্যক্রম কোনো বিরতি ছাড়াই অব্যাহত রয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, শত্রু যদি আবারও কোনো আগ্রাসন চালায়, তবে তাদের ইরানের নতুন নতুন সামরিক সরঞ্জাম, কৌশল এবং লড়াইয়ের নতুন জায়গায় মোকাবিলা করতে হবে।
ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রক্ষা করা হবে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ইরান তার পারমাণবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রক্ষা করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এগুলো ধ্বংস করতে চান। ট্রাম্পের ওই ইচ্ছার প্রতি তেহরানের এটা স্পষ্ট প্রতিবাদ। মোজতবা খামেনি বলেন, ইরানিরা দেশের পারমাণবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে তাদের জাতীয় পুঁজি হিসেবে দেখে। ভূমি, নৌ ও আকাশ সীমান্তের মতোই পারমাণবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকেও রক্ষা করবে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে না তেহরানের: ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও দেশটির জ্বালানি সরবরাহ বা বিতরণে কোনো প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করেছেন ইরানের তেলমন্ত্রী মহসিন পাকনেজাদ। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ দাবি করেন। তেলমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো ধরনের বিঘ্ন এড়াতে তেল খাতের কর্মীরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন। গত ১৩ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এ মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানে তেল মজুতের সক্ষমতা ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মজুত সংকটে ইরান শেষ পর্যন্ত তেল উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারে।
পুতিন ও ট্রাম্পের দেড় ঘণ্টার ফোনালাপে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা : রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার দেড় ঘণ্টার এক ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়েছে। ফোনালাপে পুতিন ও ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাত নিরসনে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন। ক্রেমলিনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার বার্ষিকী উপলক্ষে পুতিন ইউক্রেনে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও দিয়েছেন।
ইরান যুদ্ধে ইতিমধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ আর্থিক কর্মকর্তা জুলস ‘জেই’ হার্স্ট কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। গত বুধবার হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটিকে হার্স্ট জানান, এই ব্যয়ের বড় একটি অংশ অস্ত্রশস্ত্রের পেছনে ব্যয় হয়েছে। তবে কিছু খরচ হয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামের জায়গায় নতুন সরঞ্জাম পাঠানোর কাজে। যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট ব্যয় কত, তা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ধোঁয়াশা ছিল। কংগ্রেস যখন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব নিয়ে পর্যালোচনা করছে, তখন এটি ক্রমেই একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। হার্স্টের জবাবে কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য ও হাউস প্রতিনিধি অ্যাডাম স্মিথ বলেন, ‘আমি আনন্দিত যে আপনি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। কারণ, আমরা অনেক দিন ধরে এই তথ্যটি চাইছিলাম, কিন্তু কেউ আমাদের সেই সংখ্যাটি জানায়নি।’
ইরানের বিরুদ্ধে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র চায় মার্কিন বাহিনী : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন (হাইপারসনিক) ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাছে আবেদন করেছে দেশটির সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম)। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে সেন্টকোমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ; কিন্তু কেন্দ্রীয় কমান্ডের কোনো কর্মকর্তা এ ইস্যুতে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চারগুলো আগের অবস্থান থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। মার্কিন বাহিনী বর্তমানে যে প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে— সেসবের নাগালের বাইরে রাখা হয়েছে লাঞ্চারগুলোকে। এর প্রধান কারণ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র থেকে লাঞ্চারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা ব্লুমবার্গকে বলেছেন, বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চলছে। যদি কোনো কারণে এই যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে যায়— তাহলে সেন্টকোম প্রথম ধাক্কাতেই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চারগুলো ধ্বংস করতে চায়। এ কারনে হাইপারনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের আবেদন করেছে কেন্দ্রীয় কমান্ড। তবে এ ব্যাপারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি বলেও জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। আমরা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার মধ্যে আছে। এই পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লেবাননে ইসরায়েলের ‘হার্মিস ৪৫০জেড’ ড্রোন ভূপাতিত : দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়েছে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর দাবি, ইসরায়েলি ‘হার্মিস ৪৫০জেড’ মডেলের ড্রোনটি নাবাতিয়েহ অঞ্চলে ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে, গত বুধবার দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর পাঁচ যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল। এর আগে গত বুধবার মাজদাল জউন শহরে ইসরায়েলের টানা দুটি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। এ নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন উদ্ধারকর্মী ও একজন লেবানিজ সেনাসদস্য রয়েছেন।চলতি এপ্রিলের মাঝামাঝি ঘোষিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েল ক্রমাগত দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৫৩৪ জন নিহত ও ৭ হাজার ৮৬৩ জন আহত হয়েছেন।
