ইরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনার ঘোষণা ট্রাম্পের
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে ইরান। দেশটির দাবি, শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং সংকটের স্থায়ী সমাধানই তাদের মূল লক্ষ্য। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ গতকাল রোববার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৯ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল। তেহরান সেই প্রস্তাবের পাল্টা জবাবে এই ১৪ দফা পরিকল্পনা জমা দিল। পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি চলছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে আসা আরও এই প্রস্তাব পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরানের এই প্রস্তাবের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুরুতেই গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। ট্রাম্পের মতে, গত ৪৭ বছর ধরে ইরান বিশ্বজুড়ে যে ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে, তার তুলনায় এই প্রস্তাবগুলোতে পর্যাপ্ত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন, ‘আমি কল্পনাও করতে পারছি না যে এটি গ্রহণযোগ্য হবে। কারণ গত ৪৭ বছর ধরে তারা মানবতা এবং বিশ্বের ওপর যে আঘাত হেনেছে, তার বিপরীতে তারা এখনও পর্যাপ্ত মূল্য পরিশোধ করেনি।’
ট্রাম্পের সময় শেষ হয়ে আসছে, আইআরজিসির কড়া বার্তা : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক পোস্টে সংস্থাটি জানায়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন কূটনৈতিক পরিবর্তন ওয়াশিংটনকে এক প্রকার কোণঠাসা অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। আইআরজিসির ভাষ্যমতে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে তেহরানের বেঁধে দেওয়া এক মাসের আল্টিমেটাম এবং ওয়াশিংটনের প্রতি রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর পরিবর্তিত কঠোর অবস্থান। আইআরজিসি দাবি করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের এই সুর বদল মার্কিন প্রশাসনের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয়ই প্রতীয়মান হয় যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখন দুটি কঠিন বিকল্পের মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। হয় তাকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ‘অসম্ভব সামরিক অভিযানে’ নামতে হবে, অথবা তেহরানের সঙ্গে একটি ‘অপ্রীতিকর চুক্তিতে’ আসতে হবে। এই পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়েই আইআরজিসি উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ এখন সরু হয়ে এসেছে। নাদিন ইব্রাহিমের এই প্রতিবেদনটি পরবর্তীতে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়।
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ১৪ দফা শান্তি পরিকল্পনা দিল ইরান : লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে ইরান। দেশটির দাবি, শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং সংকটের স্থায়ী সমাধানই তাদের মূল লক্ষ্য। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ গতকাল রোববার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৯ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল। তেহরান সেই প্রস্তাবের পাল্টা জবাবে এই ১৪ দফা পরিকল্পনা জমা দিল। পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি চলছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের এক সম্মেলনে বলেন, ‘চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে পাকিস্তানের কাছে একটি পরিকল্পনা জমা দিয়েছে ইরান। এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। তারা কূটনীতির পথে হাঁটবে নাকি সংঘাত বজায় রাখবে- সেই সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে।’ তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য ২ মাসের সময় চেয়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ইরান তা নাকচ করে বলেছে, যাবতীয় সমস্যার সমাধান ৩০ দিনের মধ্যেই হতে হবে। ইরানের দেওয়া এই নতুন শান্তি পরিকল্পনায় বেশ কিছু কঠোর শর্তজুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ভবিষ্যতে কোনো প্রকার সামরিক আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সব মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে। ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ ও সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। বিদেশে জব্দ করা ইরানের সব সম্পদ ফেরত দিতে হবে। লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে।
ইরানের নতুন শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনার ঘোষণা ট্রাম্পের : ইরানের পাঠানো সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি খুব শিগগির পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। গত শনিবার ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানান। পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরান আমাদের কাছে যে পরিকল্পনা (শান্তি প্রস্তাব) পাঠিয়েছে, তা আমি শিগগিরই পর্যালোচনা করব। তবে এটি গ্রহণযোগ্য হবে বলে আমি মনে করতে পারছি না। কারণ গত ৪৭ বছর ধরে তারা মানবতা ও বিশ্বের যা ক্ষতি করেছে, তার জন্য তারা এখনো পর্যাপ্ত মূল্য পরিশোধ করেনি।’ ট্রাম্প ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে অবস্থানকালে এই মন্তব্য করেন। ইরানের পক্ষ থেকে নতুন প্রস্তাবে কী কী বিষয় রয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের পর দুদেশের চলমান উত্তেজনা নিরসনের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়ল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান ‘অসদাচরণ’ করলে আবার হামলার হুমকি ট্রাম্পের : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান ‘অসদাচরণ’ করলে দেশটিতে আবারও সামরিক হামলা চালানো হতে পারে। গত শনিবার ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি এখন চুক্তিটির চূড়ান্ত লিখিত খসড়ার অপেক্ষায় আছেন। পুনরায় হামলা শুরুর সম্ভাবনা আছে কি না— এমন প্রশ্নে ট্রাম্প সরাসরি উত্তর না দিলেও বলেন, ‘ইরান যা করেছে, তার জন্য তারা এখনো যথেষ্ট মূল্য দেয়নি। আমি এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে চাই না। তবে তারা খারাপ কিছু করলে অবশ্যই হামলার সম্ভাবনা রয়েছে।’ এদিকে ইরান তাদের ১৪ দফার নতুন প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা এবং মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা বলেছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার বিষয়টি তারা পরবর্তী সময়ের জন্য তুলে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি।
২২ কোটি ডলারের তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এড়াল ইরানের সুপার ট্যাংকার : যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধ এড়িয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে পৌঁছেছে ইরানের একটি বিশাল তেলের ট্যাংকার। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ট্যাংকারট্র্যাকারস ডটকম’ এ তথ্য জানিয়েছে। ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির (এনআইটিসি) মালিকানাধীন এই বিশাল জাহাজটির নাম ‘হিউজ’। জাহাজটি প্রায় ১৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি মার্কিন ডলার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ট্যাংকারট্র্যাকারস জানায়, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে জাহাজটিকে সর্বশেষ শ্রীলঙ্কা উপকূলে দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে এটি ইন্দোনেশিয়ার লম্বক প্রণালী হয়ে রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাচ্ছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, গত ১৩ এপ্রিল মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দর অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার সময় ‘হিউজ’ ইরানের জলসীমায় ছিল। এর আগে গত ২০ মার্চ জাহাজটি মালাক্কা প্রণালী থেকে ইরানের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর থেকে সেটির ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা এআইএস বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ২৯ এপ্রিল ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করে, তাদের অন্তত ৫২টি জাহাজ সফলভাবে মার্কিন অবরোধ ভেঙেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, অবরোধ শুরুর পর থেকে তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট অন্তত ৪১টি নৌযানকে গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই অবরোধ কার্যকরভাবে কাজ করছে এবং এর ফলে ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের কারণে দেশটি তেল রপ্তানি করতে পারছে না এবং মজুত রাখার জায়গা শেষ হয়ে গেলে তারা তেল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
যুদ্ধ বন্ধে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আরাগচির ফোনালাপ : ইরান ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি ও আইআরএনএ জানিয়েছে, ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোকে যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের নেওয়া নানা কৌশলগত ও কূটনৈতিক উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করেন। এ সময় আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, অঞ্চলজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা জরুরি। অন্যদিকে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ও উদ্যোগের প্রতি প্যারিসের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই পক্ষের মধ্যে চলমান এই আলোচনা অচিরেই মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনবে।
