যুদ্ধ শেষ করার মতো অবস্থানে নেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এমন একটি প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াশিংটন তেহরান জবাবের অপেক্ষায় থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভঙ্গুর এক যুদ্ধবিরতির মধ্যে পারস্য উপসাগরে গোলাগুলি বিনিময়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শেষ করার মতো কাছাকাছি অবস্থানে নেই বলে প্রতীয়মান হচ্ছে বলে জানিয়ে বিশ্লেষকরা।

এক মাস আগে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে গত কয়েকদিনে হরমুজ প্রণালিতে ও এর আশপাশে সবচেয়ে বড় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল আর গত শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন করে হামলার মুখে পড়ে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীসহ বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার আগে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এমন একটি প্রস্তাবের বিষয়ে তেহরান জবাবের অপেক্ষায় আছে ওয়াশিংটন। শুক্রবারের মধ্যেই ইরান জবাব দেবে বলে আশা করছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তেহরান এখনও প্রস্তাব বিবেচনা করে জবাব প্রস্তুত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।

গতকাল শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে ইরানের আধা-স্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা ফারস। পরে বার্তা সংস্থা তাসনিম ইরানের এক সামরিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, পরিস্থিতি শান্ত আছে কিন্তু আরও সংঘর্ষ হতে পারে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানি বন্দরে প্রবেশের উদ্যোগ নেওয়া ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি জাহাজে আঘাত হেনেছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান জাহাজ দুটির চিমনিতে আঘাত হেনে তাদের ফিরে আসতে বাধ্য করে।

ইরানের বার্তা সংস্থা মেহর জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় এক ক্রু সদস্য নিহত, ছয়জন নিখোঁজ ও আরও ১০ জন আহত হয়েছে। ট্রাম্প জানান, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হলেও যুদ্ধবিরতি বজায় আছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ ইরানের। গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, “প্রত্যেকবার একটি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা সামনে আসে আর যুক্তরাষ্ট্র একটি বেপরোয়া সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়।” ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর মধ্যে দিয়ে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরানি না এমন জাহাজগুলোর জন্য হরজুম প্রণালি প্রায় বন্ধ করে রেখেছে তেহরান। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই সংকীর্ণ জলপথে গন্তব্যে যেত। গত মাস থেকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। কিন্তু সিআইএ-র একটি মূল্যায়ন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের কারণে ইরান আরও প্রায় চার মাস পর্যন্ত কোনো গুরুতর অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হবে না।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা এই যুদ্ধ যা মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে আছে তা তেহরানের উপর কতোটা প্রভাব ফেলতে পারবে। দিনকয়েক আগে ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজে আটকা পড়া ২ হাজার নৌযানকে প্রণালিটি পাড়ি দেওয়ায় সহায়তা করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরুর ঘোষণা দিলেও পরে তা ৪৮ ঘণ্টার জন্য স্থগিত করেন। ইরান যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির পথ বেছে নিলেও তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে নিষেধাজ্ঞার আওতাও বাড়াচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কয়েকদিন আগে গত শুক্রবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চীনের ও হংকংয়ের বেশ কয়েকজনসহ ১০ ব্যক্তি ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি ও কোম্পানি ইরানকে তাদের শাহেদ ড্রোন তৈরির কাঁচামাল যোগাচ্ছে।

আগামী সপ্তাহে আলোচনায় বসতে পারে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থমকে থাকা আলোচনা আগামী সপ্তাহেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পুনরায় শুরু হতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, উভয় পক্ষ মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় একটি এক পৃষ্ঠার ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে।

এই সমঝোতাকে ভিত্তি করে এক মাসব্যাপী আলোচনা চালিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রনালি অঞ্চলে উত্তেজনা কমানো এবং ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিধি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত আছে, যা শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা ভেস্তে দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ‘যথাসময়ে’ জবাব দেবে ইরান : যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাব এখনো পর্যালোচনা করছে ইরান। ‘যথাসময়ে’ এর জবাব দেওয়া হবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই এ তথ্য জানান।

একইসঙ্গে বাঘেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত সময়সীমাকে গুরুত্বহীন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘এসব সময়সীমা বা চাপ সৃষ্টির কৌশলের কাছে ইরান নতি স্বীকার করবে না।’

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি অত্যন্ত কারিগরি ও জটিল হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে। পাশাপাশি তেহরানের ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরের অনুমোদনও প্রয়োজন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টের শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির অনুমোদন প্রয়োজন। খামেনির চূড়ান্ত সম্মতির পরই ওয়াশিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠানো হবে। এদিকে, সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে দ্রুত তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার ইতালির রাজধানী রোমে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

রুবিও বলেন, ইরানের সেই জবাবে কী থাকছে, তা দেখার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে তেহরানের প্রতিক্রিয়াটি ইতিবাচক হবে, যা উভয় পক্ষকে একটি গুরুত্বর ও ফলপ্রসূ আলোচনার প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে।

ভবিষ্যৎ বিশ্বে শোষণ নীতির জায়গা হবে না : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা ও শোষণের নীতির ভবিষ্যতের বিশ্বে কোনো স্থান হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

পোস্টে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের নীতি পারস্পরিক সম্মান ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বলেন, সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ও শোষণের রাজনীতি ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকতে পারবে না। সহনশীলতা ইরানি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দেশটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে দেশের অগ্রগতি ও জাতীয় পরিচয় রক্ষার এই যাত্রা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, যখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্র তার বদলে দায়িত্বহীন সামরিক তৎপরতার পথ বেছে নেয়।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, এটি কি চাপ প্রয়োগের চেষ্টা, নাকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরেকটি জটিল সংঘাতে জড়িয়ে ফেলার ফলাফল।