দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বৃষ্টি

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

মাদারীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। অনেক স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে। যুক্তরাষ্ট্রে এক মার্কিন নাগরিক রুমমেট কর্তৃক নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন বৃষ্টি ও তার আরেক বন্ধু জামালপুরের যুবক লিমন।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত শনিবার দুপুরে বৃষ্টির মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের চরগোবিন্দপুর এসে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্নায় আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বাদ আছর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তার মরদেহ দাফন করা হয়। এই মেধাবী শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যার কঠোর বিচার দাবি করেন পরিবারের সদস্য, স্বজন ও এলাকাবাসী।

পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা চরগোবিন্দপুর গ্রামের জহিরুল ইসলাম আকন (দিলু) ও আইভি বেগম দম্পতির মেয়ে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। দুই ভাই বোনের মধ্যে ছোট বৃষ্টি। একটি ইন্সরেন্স কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে বাবা জহিরুল ইসলাম পরিবার নিয়ে ঢাকার মিরপুর এলাকায় বসবাস করেন। ঈদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই আসেন গ্রামে। তাই ঢাকাতেই লেখাপড়া করেন বৃষ্টি।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন বৃষ্টি। পরে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে গত প্রায় ৯ মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পিএইচডি করতে যান তিনি। সেখানে বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই ফোনে পরিবারকে জানান আগামী ১৭ মে দেশে আসবে। বাবা, মা, ভাইসহ গ্রামে এসে স্বজনদের সঙ্গে উদযাপন করবেন ঈদ আনন্দ। সে আশা আর পূরণ হলো না। দেশে ঠিকই আসলেন, তবে লাশ হয়ে।

মেধাবী শিক্ষার্থী বৃষ্টির এমন মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ পরিবার। বৃষ্টিকে এক নজর শেষবারের মত দেখতে শনিবার সকাল থেকেই মাদারীপুরের চরগোবিন্দপুর গ্রামে বৃষ্টির বাড়িতে মানুষের ঢল নামে। দুপুরে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে এলে এক হৃদয়বিদারক অবস্থা সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বাদ আছর চর গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। এ হত্যকাণ্ডের কঠোর বিচার দাবি করেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

নিহত বৃষ্টির বাবা জহিরুল ইসলাম আকন দিলু বলেন, এখন আর চাওয়ার কিছু নাই। আমার মেয়েকে ঘিরে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। শুধু হত্যাকারীর কঠোর বিচার হোক এটা ছাড়া আর কিছু চাই না।

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির স্বপ্ন ছিল কেমিক্যালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে গর্বের সঙ্গে দেশে ফিরে আসবে এবং দেশের জন্য অত্যাধুনিক কিছু তৈরি করে দেখাবে। বাড়িতে এসে নতুন ভবন উদ্বোধন করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ সবই শেষ। একইভাবে বিচার দাবি করে শোকে কাতর বৃষ্টির মা আইভি বেগমও। এদিকে সঠিক বিচার পেতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানান মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা সাবাব।

ঘাতকের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয় : যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন বলেছেন, জুলাইয়ের ১৭ তারিখে মেয়ের দেশে ফেরার কথা ছিল। প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সে বিমানবন্দরে নামবে, আমরা নিতে আসব। কিন্তু তার আগেই ওকে নিতে এলাম। তবে জীবিত নয়, মৃত, এই আর কি। গতকাল শনিবার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মেয়ের মরদেহ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। জহির উদ্দিন আকন বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের ইচ্ছে ছিল, বড় কিছু হবে এবং অত্যন্ত মেধাবী ছিল। সেভাবেই পরিশ্রম করে লেখাপড়া করত। পাশাপাশি তার ধর্মীয় বিদ্যাও ছিল অনেক। তিনি বলেন, বৃষ্টির ইচ্ছে ছিল দেশে এসে বড় কিছু করবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করবে। এই ছিল তার প্রবল ইচ্ছা এবং একটা সার্টিফিকেট অর্জন করবে।

তিনি আরও বলেন, মেয়ের ডিজাইন করা একটা বাড়ি গ্রামের বাড়িতে করেছিলাম। সে এসে বাড়িটা উদ্বোধন করবে, এই প্রত্যাশা ছিল আর কি। গ্রামে যত দুঃখী মানুষ আছে, তাদের পাশে সব সময় থাকবে, এই ইচ্ছে ছিল তার।

বৃষ্টির বাবা বলেন, মেয়ের ইচ্ছে ছিল বাড়ির সামনে নেমপ্লেটে লেখা থাকবে ড. নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। সার্টিফিকেট যদিও পেয়েছে কিন্তু সেটা মরণোত্তর সার্টিফিকেট।

তিনি আরও বলেন, সবার কাছে দোয়া চাই। ঘাতকের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়, আমাদের বাংলাদেশের প্রশাসনের পক্ষ থেকে বা মন্ত্রণালয় থেকে যেন এটা বলা হয়। ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি যেন মৃত্যুদণ্ড হয়, এইটা আমি আশা করি। এর আগে বৃষ্টির মরদেহ নিয়ে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হন। পরে ২৪ এপ্রিল লিমন এবং ২৬ এপ্রিল বৃষ্টির মরদেহ পাওয়া যায়। গত সোমবার ৪ মে লিমনের মরদেহ দেশে পৌঁছায়।

বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার : পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নিহত শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ ঘটনায় মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। গতকাল শনিবার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৃষ্টির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এটি একটি করুণ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। বৃষ্টির পরিবার যে গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা সরকার উপলব্ধি করে। এখানে বৃষ্টির বাবা, মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত আছেন। আমি বৃষ্টির পরিবার, স্বজন ও বন্ধুদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং বৃষ্টির আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।’

আসাদ আলম সিয়াম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বাংলাদেশ দূতাবাস, ওয়াশিংটন ডিসি এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, ফ্লোরিডা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে কাজ করছে। সরকার আশা করে বৃষ্টির পরিবার এ হত্যাকাণ্ডের সঠিক ও সুষ্ঠু বিচার পাবে।’