কাতার-কুয়েত-আমিরাতে ড্রোন হামলা, জাহাজে অগ্নিকাণ্ড

* ইরানি কর্মকর্তার হুঁশিয়ারি, সংযম শেষ, মার্কিন অবকাঠামোতে হবে শক্তিশালী হামলা * যুদ্ধের অবসানে মার্কিন প্রস্তাবের জবাব দিল ইরান * শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে তাক করা আছে ক্ষেপণাস্ত্র : আইআরজিসি কমান্ডার

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের কথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশে ড্রোন হামলা হয়েছে। এই হামলায় কাতারে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আগুন ধরে গেলেও কুয়েত এবং আমিরাতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য জানা যায়নি। গতকাল রোববার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদন থেকে পৃথক এসব হামলার তথ্য জানা যায়। এতে বলা হয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া অন্তত দুটি ড্রোনকে নিজেদের আকাশে শনাক্ত এবং বাধা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনী। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের এসব প্রকাশ্য হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত মোট ৫৫১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ২৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২৬৫টি ড্রোন মোকাবিলা করেছে। এদিকে, একই দিনে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, রোববার আবুধাবি থেকে দেশটির জলসীমায় প্রবেশ করা একটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এতে জাহাজটিতে সামান্য আগুন ধরে গেলেও হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘রোববার সকালে আবুধাবি থেকে আসা পণ্যবাহী ওই বাণিজ্যিক জাহাজ মেসাইদ বন্দরের উত্তর-পূর্ব দিকে কাতারের জলসীমায় ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এই ঘটনার ফলে জাহাজে সীমিত পর্যায়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও কেউ আহত হননি।’ এর আগে, ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক একটি সংস্থা দোহার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র সদৃশ বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া কুয়েতের সামরিক বাহিনী রোববার ভোরের দিকে দেশটিতে ড্রোন হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে।

দেশটির সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, ‘আজ ভোরে সশস্ত্র বাহিনী কুয়েতের আকাশসীমায় বেশ কিছু শত্রু ড্রোন শনাক্ত করেছে। এসব ড্রোনকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মোকাবিলা করা হয়েছে।’ তবে ড্রোনগুলো কোথা থেকে এসেছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানায়নি কুয়েত।

যুদ্ধের অবসানে মার্কিন প্রস্তাবের জবাব দিল ইরান : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের বিপরীতে নিজেদের জবাব পাঠিয়ে দিয়েছে ইরান। রোববার মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে এই জবাব পাঠানো হয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আলোচনার প্রথম ধাপে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও শত্রুতার অবসানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে তেহরান।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিনিধি কামাল হায়দার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিপরীতে ইরানের পাঠানো প্রস্তাব পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে পাকিস্তান। ইরান বলেছে, ‘যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত সর্বশেষ খসড়ার বিপরীতে রোববার পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাদের জবাব পাঠিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য জানায়নি দেশটির এই সরকারি সংবাদমাধ্যম। আল-জাজিরার প্রতিনিধি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিপরীতে ইরানের জবাব হাতে পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। এখন দেখার বিষয় পাকিস্তান কবে নাগাদ এটি ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেয় এবং সেটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হয়।

ইরানি কর্মকর্তার হুঁশিয়ারি-ইরানের ‘সংযম’ শেষ, মার্কিনিদের অবকাঠামোতে হবে শক্তিশালী হামলা : ইরানের পার্লামেন্টের বৈদেশিক নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বলেছেন, ইরান যে সংযম এতদিন প্রদর্শন করেছে। এটি আজকে থেকে শেষ। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ট্যাংকার জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায় তাহলে এখন থেকে মার্কিনিদের অবকাঠামো লক্ষ্য করে শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। গতকাল রোববার মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের জাহাজের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ও ঘাঁটিতে শক্তিশালী এবং কঠোর হামলার মাধ্যমে।’

‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের (স্থাপনা) সময় ফুরিয়ে আসছে। ভালো হবে যদি তারা বোকার মতো আচরণ না করে এবং যে চোরাবালিতে আটকা পড়েছে সেটিতে যেন আরও দেবে না যায়। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আত্মসমর্পণ এবং পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া। আপনাদের অবশ্যই নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে।’ এরআগে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আক্রামি নিয়া হুঁশিয়ারি দেন, যেসব দেশ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের সঙ্গে যোগ দেবে তাদের জাহাজ হরমুজে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ হামলা চালায়। এরপর ওইদিনই হরমুজ বন্ধ করে দেয় তেহরান। হামলার পর ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা ৪০ দিন যুদ্ধ হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হয়। যা এখনও অব্যাহত আছে।

শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে তাক করা আছে ক্ষেপণাস্ত্র- আইআরজিসি কমান্ডার : ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি বলেছেন, বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এরই মধ্যে শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে তাক করা হয়েছে এবং হামলার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। এক বার্তায় তিনি বলেন, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো অঞ্চলে থাকা মার্কিন লক্ষ্যবস্তু এবং আগ্রাসী শত্রুর জাহাজগুলোর ওপর তাক করা আছে। তিনি আরও বলেন, আমরা শুধু হামলার নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। ওই হামলায় ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি এবং দেশটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে ইরান দাবি করে। এর জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয় বলে তেহরানের দাবি। ইরান জানিয়েছে, ৪০ দিনের মধ্যে ১০০ দফা পাল্টা হামলায় তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা ইসলামাবাদে আলোচনার পথ তৈরি করে। ওই আলোচনায় ইরান ১০ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করে, যার মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ও ছিল। তবে ইরান স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না হলে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনায় ফেরার কোনো সুযোগ নেই। তেহরানের দাবি, চলমান অবরোধ যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে।

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব পুতিনের : ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় সরিয়ে নিয়ে সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলাদিমির পুতিন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পরিবহন ও সংরক্ষণে মস্কো প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি। মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিন বলেন, ২০১৫ সালে রাশিয়া ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছিল এবং তারা ‘সেই অভিজ্ঞতা আবারও পুনরাবৃত্তি’ করতে প্রস্তুত। তিনি জানান, সংঘাত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান কঠোর করে এবং ইউরেনিয়াম শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে নেওয়ার দাবি তোলে। এরপর ইরানও নিজেদের অবস্থান কঠোর করে।

পুতিন বলেন, মস্কো ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রাখবে। একইসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান সংকট ‘যত দ্রুত সম্ভব’ শেষ হবে। তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।