কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়
ঢাবিতে কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারের সংখ্যা বেশি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সর্বস্তরে পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেছেন, ‘নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়।’ গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা রূপান্তর : টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হয়। উচ্চ শিক্ষা নিয়েও অনেককে বেকার থাকতে হয়। অর্থাৎ বেকারত্বের সংখ্যা উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেশি। ‘এর কারণ সম্পর্কে নানামত রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে অনেকেই একমত- অ্যাকাডেমিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করতে না পারাই শিক্ষিত মধ্যে বেকারত্বের হার বেশির অন্যতম কারণ।’
পাঠ্যক্রম সময়োপযোগী করার কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বর্তমান সরকার মনে করে, প্রাথমিক সিলেবাসে থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়।’
‘সময়োপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এ কারণেই বর্তমান সরকার অ্যাকাডেমিক সিলেবাসকে সময়োপযোগী করার কাজ শুরু করেছে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে বর্তমান সরকার অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ‘প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপন করে এই কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীগণ পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের পাশাপাশি হাতে কলমে শিক্ষা লাভ করে শিক্ষার্থী অবস্থাতেই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। ফলে শিক্ষা জীবন শেষে তাকে আর বেকার থাকতে হবে না।’
বর্তমান সরকারের উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ ‘এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- ক্যাম্পাস থেকে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা তৈরি করা। ফলে এই উদ্যোক্তারা নতুন এবং সৃজনশীল ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় কর্মদক্ষতা অর্জনের ফলে এমনও হতে পারে- একজন শিক্ষার্থী চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আরও কয়েকজনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। এসব উদ্যোগ ছাড়াও সরকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’, ‘সায়েন্স পার্ক’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে।
‘দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান মেলা, ইনোভেশন ফেয়ার, প্রোডাক্ট সোর্সিং ফেয়ারসহ এ ধরনের শিক্ষা ও দক্ষতাবিষয়ক আয়োজনকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। শুধু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, স্কুল পর্যায় থেকেই সরকার শিক্ষা কারিকুলামে কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে।’
ব্রিটিশ লেখক অ্যালান ডিবের উদ্ধৃতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, কর্মশালার বিষয়বস্তুর সঙ্গে টম উইনের একটি মন্তব্য বেশ প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে।
‘গবেষণা ও উদ্ভাবনে মনোযোগ দিন’ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আজকে দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন আমি বিশ্বাস করি এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। আপনারা যারা এতক্ষণ আলোচনা করলেন, এইসব আলোচনায় শিক্ষা ও গবেষণায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে পারছে কি না- এমন একটি প্রশ্ন অনেকের আলোচনায় ফুটে উঠেছে।
‘দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনও প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত গবেষণা প্রকাশনা, সাইটেশন এবং উদ্ভাবন- এই বিষয়গুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কোথায় এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিদরা নিশ্চয় আরো চিন্তাভাবনা করবেন। ‘শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা এবং উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে।’ বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পা দিয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চলমান এই সময়ে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডেটা, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজি, পঞ্চম প্রজন্মের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি- এসব উন্নত প্রযুক্তি একদিকে আমাদের আমাদের চিন্তার জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। ‘অন্যদিকে শাসন করছে মানুষের কর্মক্ষেত্র বা কর্মসংস্থান। এর ফলে নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহার একদিকে প্রথাগত চাকরির বাজারে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নিত্য-নতুন কর্মসংস্থান।
‘মেধাভিত্তিক দেশ গড়তে চাই’ : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সামর্থ্য সীমাহীন না হলেও সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে অবশ্যই আমাদের পক্ষেও নতুন কিছু করা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, আমাদেরও প্রচুর মেধাবী মানুষ রয়েছেন, যারা সুযোগ বা সুবিধা পেলে তাদের পক্ষেও বিশ্বমানের কিছু করা অসম্ভব নয়। মেধাপাচার রোধ করে মেধার বিকাশ ও মেধার লালন করে আমরা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাই।
‘ফ্যাসিবাদণ্ডস্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আমাদের তারুণ্য বারবার রাজপথে নেমে এসেছে। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণ বারবার অধিকার আদায়ের মিছিলে শামিল হয়েছে। এভাবেই দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এই সরকার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চায়। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গড়তে চায়।’ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত এ কর্মশালায় পাঁচটি টেকনিক্যাল অধিবেশন রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় মনজুরী কমিশনের ক্রেস্ট উপহার দেন কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক, ইউজিসি সচিব ফখরুল ইসলাম। যুক্তরাজ্য থেকে দেশ ফেরার পর গত ২৭ ডিসেম্বর তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে। এরপর বাংলা একাডেমির বইমেলা উদ্বোধন করতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। এরপর ওই এলাকায় শিক্ষা বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন সরকারপ্রধান।
