ট্রাম্প-শির বৈঠকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার আভাস

* প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত : ট্রাম্পকে শি জিনপিং * তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পকে চীনা প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি * শির সঙ্গে অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে : ট্রাম্প

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রথমবারের মতো চীন সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকের সঙ্গে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, তাইওয়ান ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো উঠে আসে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে তার সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের পর ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন চীনের প্রেসিডেন্ট। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, ইউক্রেন সংকট এবং কোরীয় উপদ্বীপসহ প্রধান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুগুলো নিয়ে পারস্পরিক মতবিনিময় করেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং অংশীদারত্বের হওয়া উচিত। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে শি জিনপিং বলেন, এমন এক সময় তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে ‘খুবই আনন্দিত’, যখন বিশ্ব ঐতিহাসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ও ‘বিশ্ব এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে’। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন চীনা নেতা।

শি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ অতিক্রম করে বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্কের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারবে? তিনি আরও বলেন, আমরা কি একসঙ্গে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশ্বে আরও বেশি স্থিতিশীলতা আনতে পারব? চীনা প্রেসিডেন্ট প্রশ্ন তোলেন, আমরা কি আমাদের দুই দেশের জনগণের কল্যাণ ও মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব? শি জিনপিং বলেন, মূলত এগুলো ইতিহাস, বিশ্ব এবং জনগণের করা প্রশ্ন। আর বড় দুই দেশের নেতা হিসেবে আপনাকে ও আমাকে একসঙ্গে এর উত্তর লিখতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকলে তা ‘পুরো বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ’ হবে। তাই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত।

তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পকে চীনা প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি : বেইজিংয়ে শুরু হওয়া দুই দিনের যুক্তরাষ্ট্র ও চীন শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাইওয়ান ইস্যুতে কড়া বার্তা দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বাণিজ্য আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানালেও জিনপিং সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে মতপার্থক্য দুই দেশের সম্পর্ককে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে, এমনকি এর ফলে সংঘাতও তৈরি হতে পারে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাইওয়ান ইস্যুতে জিনপিংয়ের এই মন্তব্য ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং নজিরবিহীন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া আলোচনার সারসংক্ষেপে তাইওয়ান প্রসঙ্গের কোনও উল্লেখ নেই। মার্কিন বিবৃতির পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইরান যুদ্ধের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার বিষয়ে দুই নেতার যৌথ আকাঙ্ক্ষার ওপর। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চীন মার্কিন তেল কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জনপ্রিয়তায় টান পড়ায় প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রথম চীন সফর ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সফরের শুরুতে এক জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প জিনপিংকে উদ্দেশ্য করে বলেন, অনেকে বলছেন এটি সম্ভবত এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় শীর্ষ সম্মেলন। বাণিজ্যিক ইস্যু নিয়ে জিনপিং জানান, বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা ‘সামগ্রিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং ইতিবাচক’ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গত অক্টোবরে করা একটি ভঙ্গুর বাণিজ্য চুক্তি বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগের পথ সুগম করার লক্ষ্যেই এই আলোচনা চলছে।

চীনে রুবিওর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল, আজ তিনি ট্রাম্প-শির বৈঠকে : বেইজিং সফরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। বৈঠকে হাজির ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অথচ তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল চীন। এর আওতায় তার দেশটিতে প্রবেশ মানা রয়েছে। রুবিওর বিরুদ্ধে চীন কেন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার পরও প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী হয়ে তিনি কীভাবে বেইজিং গেলেন, কীভাবে ট্রাম্প-শির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে হাজির থাকার সুযোগ পেলেন- এসব প্রশ্ন এখন বেশ আলোচিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব পিপল’- এ প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকে ট্রাম্পের অন্য সফরসঙ্গীদের সঙ্গে ছিলেন রুবিও। কিন্তু কীভাবে? আল-জাজিরা বলেছে, নিষেধাজ্ঞায় থাকা রুবিওর বেইজিং সফরের পথ খুঁজে বের করেছে চীন নিজেই। এ জন্য দেশটি স্বভাবসুলভভাবে একটি কৌশলী উপায় খুঁজে নিয়েছে। তাকে নতুন একটি চীনা নাম দিয়ে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেই দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সময়টা ২০২০ সাল। রুবিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হননি। যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনেটরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় বেইজিং। নিষেধাজ্ঞার ওই তালিকায় টেড ক্রুজসহ মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্যও ছিলেন। ওই সময় বলা হয়েছিল, হংকং আর মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়ানে গৃহীত নীতি নিয়ে চীনের কঠোর সমালোচনা করায় রুবিওসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তারা চীন সফর করতে পারবেন না।

এরপর সময় গড়িয়েছে। হোয়াইট হাউসে আবারও এসেছেন ট্রাম্প। এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে রুবিওকে বেছে নিয়েছেন তিনি। এখন সফর করছেন চীনে। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন না, তা কি হয়? রুবিওর প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী হওয়ায় সম্ভাব্য জটিলতার বিষয়টি আগেই নজরে এসেছিল। গত মার্চে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রুবিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হতে চাইলে, তার বিরুদ্ধে থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনে শিথিল করা হবে। এ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান গত ১৬ মার্চ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সিনেটর পদে থাকার সময় চীনের বিষয়ে রুবিওর কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করে চীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

শির সঙ্গে অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে- ট্রাম্প : বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার চীন সফরের প্রথম পূর্ণ দিবসে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় এই মন্তব্য করেন তিনি। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত জমকালো অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, আজ দিনভর চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা এবং বৈঠক হয়েছে। এই সন্ধ্যাকে তিনি বন্ধুদের মধ্যে আলাপচারিতার এক মূল্যবান সুযোগ বলেও অভিহিত করেছেন।

বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই শীর্ষ সম্মেলনকে অত্যন্ত ইতিবাচক আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি আগামী সেপ্টেম্বরে তাকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট শি, আপনার এই চমৎকার অভ্যর্থনার জন্য আবারও ধন্যবাদ। আপনাকে এবং মাদাম পেংকে (চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিউয়ান) আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউস সফরের আমন্ত্রণ জানাতে পেরে আমি গর্বিত। আমরা আপনাদের অপেক্ষায় থাকব। ভোজসভায় মার্কিন ও চীনা জনগণের মধ্যে ‘সমৃদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের’ প্রতি সম্মান জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, এটি অত্যন্ত বিশেষ এক সম্পর্ক। আমি আপনাকে আবারও ধন্যবাদ জানাতে চাই; এটি ছিল এক অসাধারণ সময়।

ট্রাম্প বলেন, ??আজ আমাদের মধ্যে যেসব বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর। আপনার সঙ্গে এই সময়টি কাটানো আমার জন্য ছিল সম্মানের। আমেরিকান ও চীনা জনগণের সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই বিদ্যমান বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এ সময় শির আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম, সাহস ও সাফল্যের মতো অনেক অভিন্ন মূল্যবোধ রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দুই দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিশ্ব এক অনন্য রূপ পায়। গত ৯ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন ট্রাম্প।