জাবিতে প্রক্টরের কার্যালয়ে তালা

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তি ধরা না পড়ায় প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলমের পদত্যাগের দাবিতে তার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়েছেন আন্দোলনকারী ছাত্রীরা।

একই সঙ্গে প্রক্টরকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হলে আগামীকাল রেজিস্ট্রার ভবনেও তালা দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রক্টরের কার্যালয়ে গিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে শনিবার দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ‘জরুরি জনসচেতনতামূলক বার্তায়’ ধর্ষণচেষ্টার ওই আসামির সন্ধান দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সন্দেহভাজনের ছবি প্রকাশ করে তার পরিচয় বা অবস্থানের তথ্য ০১৩২০-০৮৯৩০৫ নম্বরে জানানোর অনুরোধ করেছে পুলিশ। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য তথ্যদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে বলে জানানো হয়েছে। গত সোমবার রাতে ফজিলাতুন্নেছা হলের পাশে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে অজ্ঞাতনামা এক দুর্বৃত্ত। পরদিন আশুলিয়া থানায় মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। অন্যথায় প্রক্টরসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবি জানান তারা। গতরাতে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ায় রাত দেড়টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ছাত্রীদের আবাসিক হল ঘুরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘গত দুই বছরে ক্যাম্পাসে ঘটা বিভিন্ন ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বারবার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আমরা তাদের পদত্যাগ চাই।’ নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে বারবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রক্টরের এখনই পদত্যাগ করা উচিত।’

ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় উত্তাল জাবি, প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিতে রাতভর বিক্ষোভ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তারে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে রাতভর বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলমসহ প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি করেছেন।

গতকাল শনিবার দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হল ঘুরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে তারা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান নেন। গত মঙ্গলবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন সড়ক থেকে এক ছাত্রীকে জোর করে পাশের জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বুধবার আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঘটনার প্রতিবাদে গত বুধবার রাতেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। পরে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে তারা ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হলে প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করা হবে বলেও জানান তারা।

শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করা, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার, কুইক রেসপন্স টিমে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বারবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রক্টর নৈতিকভাবে দায়িত্বে থাকার অধিকার হারিয়েছেন। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘গত দুই বছরে একের পর এক ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই সর্বসম্মতিক্রমে তাদের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।’

নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘গত আড়াই বছরে নারী শিক্ষার্থীরা বারবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রক্টরিয়াল বডি এসব ঘটনায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। আমরা হতাশ। তাদের আর সময় দেওয়ার সুযোগ নেই।’

রাত আড়াইটার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। উপাচার্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা কর্মকর্তা-কর্মচারী অপরাধ করলে প্রক্টরিয়াল বডি ব্যবস্থা নেয়। তবে বাইরের কেউ অপরাধ করলে সেটি মূলত পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত ফৌজদারি বিষয়।’

পরে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দাবি জানালেই কোনো প্রক্টর পদত্যাগ করতে পারেন না। তদন্তের মাধ্যমে প্রক্টরিয়াল বডির কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।’

তবে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান।

ভোর ৫টার পর প্রক্টর রাশিদুল আলম সেখানে উপস্থিত হয়ে বলেন, গত ১৮ মাসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করেছেন। পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা জাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সাম্প্রতিক ঘটনার পর মামলা করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শিক্ষার্থীরা পুনরায় তার পদত্যাগ দাবি করলে প্রক্টর বলেন, উপাচার্য তাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তিনি চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়াতেই বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত।

এর জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষকেরা আমাকে উপাচার্য বানিয়েছেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নয়। তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রক্টরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। গাফিলতির প্রমাণ মিললে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সাত দিনের মধ্যে তদন্তের ফল জানানো হবে।’ তবে শিক্ষার্থীরা এ আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।

পরে সকাল সাড়ে গতকাল শনিবার সকাল ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে প্রক্টর অফিসের দিকে যান এবং সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেন। এসময় তারা প্রক্টরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেফরুল হাসান চৌধুরী সজল জানান, প্রক্টর অফিস এখনও তালাবদ্ধ রয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, আগামীকাল তারা রেজিস্ট্রার ভবনেও তালা দেবেন। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং প্রক্টর পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

সিসিটিভিতে দেখা ব্যক্তির তথ্য দিলে পুরস্কার দেবে পুলিশ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে জনসাধারণের সহায়তা চেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে দেখা এক ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

গতকাল শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক জরুরি জনসচেতনতামূলক বার্তায় এ অনুরোধ করা হয়েছে।

পুলিশের বার্তায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। কারও কাছে তাঁর পরিচয়, অবস্থান বা সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য থাকলে ০১৩২০–০৮৯৩০৫ (হোয়াটস অ্যাপ) এই নম্বরে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের বার্তায় আরও বলা হয়, তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে। নির্ভরযোগ্য তথ্য দিলে পুরস্কারেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ওই ছাত্রী ক্যাম্পাসের ভেতরে সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর পিছু নেন। একপর্যায়ে ছাত্রীর গলায় জাল পেঁচিয়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন ওই ব্যক্তি। ছাত্রী নিজেকে রক্ষা করে সড়কে চলে আসেন। এ সময় সড়কে চলাচলকারী কয়েকজন ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। পরে ছাত্রীসহ শিক্ষার্থীরা সিসিটিভি ফুটেজে একজনকে দেখতে পান। তবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় গত বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. জেফরুল হাসান চৌধুরী বাদী হয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে অজ্ঞাতনামা একজনের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেন।