ঝড়ের আগের স্তব্ধতা মধ্যপ্রাচ্যে

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

যুদ্ধ বন্ধে সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রকে পাঁচ শর্ত দিয়েছিল ইরান। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামনে ওই শর্তের বিপরীত নিজস্ব পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। মার্কিন এই পাঁচ শর্ত দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে ওয়াশিংটন প্রশাসন। গতকাল রোববার ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ভূখণ্ডে বোমা হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ওয়াশিংটনের দাবি, ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নিতে হবে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র মাত্র একটি কার্যকর পারমাণবিক স্থাপনা রাখতে পারবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের জব্দ করা সম্পদের ২৫ শতাংশের বেশি মুক্ত করতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে বলেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন।

ফার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- ১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা (বিশেষ করে লেবাননে) ২. ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ৩. জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা ৪. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও ৫. হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া।

সূত্রটি আরও জানায়, যুদ্ধবিরতির পরও আরব সাগর ও ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে তেহরানের অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে এমন বার্তা পাঠিয়েছে ইরান।

উল্লেখ্য, জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর প্রতিবাদে টানা ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান। এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। ইরানের তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ দিনের যুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ৩ হাজার ৩৭৫ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া জরুরিচিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন।

আগামী সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল : ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইরানে আবারও হামলা চালাতে পারে দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এরজন্য তারা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্যের দুজন কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে এ তথ্য জানান।

সংবাদমাধ্যমটিকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়ছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানে আগের চেয়ে তীব্র বোমাবর্ষণ করা হবে। এতে টার্গেট করা হবে সামরিক ও অন্যান্য অবকাঠামো। এরসঙ্গে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের তেল রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখল করার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের মূল ভূখণ্ডে কমান্ডো পাঠিয়ে সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম নিয়ে আসা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা। তবে ইউরেনিয়াম আনার বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এতে অনেকে হতাহত হতে পারেন। এরসঙ্গে সহায়তাকারী বাহিনী হিসেবে কয়েক হাজার সেনাকে সেখানে উপস্থিত রাখতে হবে। যাদের সঙ্গে ইরানি সেনাদের সরাসরি লড়াই হতে পারে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ কে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধ অত্যাসন্ন এমনটি ধরে নিয়ে ইসরায়েল প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে তাকিয়ে আছেন। ট্রাম্প ইরানিদের সঙ্গে কীভাবে আলোচনা করবেন সেটির দিকে তারা নজর রাখছেন।

অজ্ঞাত এ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আমেরিকানরা বুঝতে পেরেছে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কোনো সমাধানই আসবে না। আমরা কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও অনেক কিছু জানব।’ এরআগে গত শুক্রবার চীন সফর থেকে দেশে ফেরার পথে ট্রাম্প জানান, ইরান যদি সত্যিকার অর্থে প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা ২০ বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বন্ধ রাখবে তাহলে তিনি বিষয়টি ভেবে দেখবেন। এরআগে ট্রাম্প শর্ত দিচ্ছিলেন, ইরানকে চিরজীবনের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বন্ধ করতে হবে।

রহস্যময় ছবি শেয়ার করে কী ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালাতে পারে এমন খবরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি শেয়ার করেছেন। সেখানে তাকে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর এক অ্যাডমিরালকে উত্তাল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পেছনে থাকা কয়েকটি জাহাজের একটিতে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতাকা উড়তে দেখা যায়। ছবিটিতে লেখা ছিল, ঝড়ের আগে শান্ত স্তব্ধতা। ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এ খবর জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানকে আবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, শান্তি চুক্তি না হলে দেশটিকে ‘খুব খারাপ সময়ের’ মুখোমুখি হতে হবে। একটি চুক্তিতে পৌঁছানোই তাদের স্বার্থের জন্য ভালো।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভিকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, দ্রুত শান্তি চুক্তি না হলে ইরান কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যুদ্ধ অভিযানের আনুষ্ঠানিক নাম পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। নতুন নাম হতে পারে ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’।

এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক এই বক্তব্য ও সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের খবর ঘিরে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কে।

আমেরিকার যে-কোনো বোকামির পুনরাবৃত্তির ফল হবে আরও কঠোর - ব্রি. জে. শেকারচি : ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকির পুনরাবৃত্তি ও অবাস্তব বক্তব্য প্রসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সিনিয়র মুখপাত্র ব্রি. জে. শেকারচি বলেন: আমেরিকার যে-কোনো বোকামির পুনরাবৃত্তির ফল হবে অঅগের চেয়েও কঠোর। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধে অপমান ঢাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার কোনো বোকামি করে, তবে তার ফল হবে আরও বেশি কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক। ফার্স নিউজ এজেন্সির রাজনৈতিক ডেস্কের বরাত দিয়ে পার্সটুডে আরও জানিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীর সিনিয়র মুখপাত্র আবুল ফাজল শেকারচি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভ্রান্ত প্রেসিডেন্টের ইরান বিরোধী হুমকির পুনরাবৃত্তি এবং ভিত্তিহীন বক্তব্যের জবাবে বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের অপমান মুছতে আবারও কোনো বোকামি করে, তাহলে তারা আরও কঠোর ও বিধ্বংসী জবাব পাবে।

তিনি আরও বলেন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসহায় প্রেসিডেন্টকে জানা উচিত, যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবার কোনো হুমকি বাস্তবে রূপ নেয় বা আগ্রাসন চালানো হয়, তাহলে সেই দেশের সম্পদ ও দুর্বল হয়ে পড়া সেনাবাহিনী নতুন, আক্রমণাত্মক, আকস্মিক ও ঝটিকা অভিযানের মুখোমুখি হবে। এমনকি তারা নিজেদের তৈরি করা জলাবদ্ধতায় ডুবে যাবে, যা তাদের প্রেসিডেন্টের দুঃসাহসিক নীতিরই ফল।

ভবিষ্যৎ গ্লোবাল সাউথের - ইরানের স্পিকার : ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ইরানি জাতির ৭০ দিনের ‘বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ’ বিশ্বে শতাব্দীতে দেখা যায়নি এমন পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে এবং এর মধ্য দিয়ে নতুন বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হচ্ছে। খবর প্রেসটিভি। গত শনিবার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব এখন একটি নতুন ব্যবস্থার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে গালিবাফ বলেন, ‘শতাব্দীতে দেখা যায়নি এমন পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে দ্রুত এগিয়ে চলছে।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ‘আমি জোর দিয়ে বলছি, ইরানি জাতির ৭০ দিনের প্রতিরোধ এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যৎ গ্লোবাল সাউথের।’

গালিবাফের বক্তব্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, উদীয়মান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে দেখছে। তার দাবি, গত ৭০ দিনে ইরানি জনগণ ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও ‘বিপ্লবী চেতনা’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি ও ভয় দেখানোর যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতাকেই উন্মোচিত করেছে।

প্রেসটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের এই প্রতিরোধ শুধু দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেনি, বরং লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু উন্নয়নশীল দেশের কাছেও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। এসব দেশের অনেকেই মনে করছে, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক আধিপত্যনির্ভর পশ্চিমা প্রভাবের যুগ ধীরে ধীরে শেষের পথে।

ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মনির্ভরতা, জাতীয় ঐক্য এবং ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর প্রতি অঙ্গীকার একটি ‘ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার পথকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইসরাইল অধিকৃত অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

এ ছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও জ্বালানি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

পরবর্তীতে যুদ্ধের ৪০তম দিনে, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হলেও ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান ও সর্বোচ্চ দাবির কারণে তা কোনো চুক্তিতে পৌঁছায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় ‘মধ্যস্থতা’ করতে তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা থমকে আছে। এই আলোচনা এগিয়ে নিতে গতকাল শনিবার তেহরানে গেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। ইরানের সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ‘আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান টানা চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মহসিন নাকভি আজ (শনিবার) দুই দিনের সরকারি সফরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে পৌঁছেছেন।’

ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি তাকে স্বাগত জানান। কয়েক দিন আগেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফর করেছিলেন। এরপরই নাকভি এ সফরে গেলেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনায় পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতা করছে। গত মাসেই তারা দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করেছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে হামলা চালালে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ৯ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলে এ লড়াই অনেকটাই থেমে যায়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শুক্রবার বলেন, তাঁরা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কিছু বার্তা পেয়েছেন। এ বার্তায় বোঝা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। এর আগে ইরানের দেওয়া একটি পাল্টা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছে। এরপর গত মঙ্গলবার ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ওয়াশিংটনের উচিত শান্তির জন্য তেহরানের দেওয়া প্রস্তাব মেনে নেওয়া। তা না হলে তাদের ‘ব্যর্থতার’ মুখে পড়তে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, ‘১৪ দফার প্রস্তাবে ইরানের জনগণের যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। অন্য কোনো পথে গেলে কোনো ফল আসবে না, বরং একের পর এক ব্যর্থতা জুটবে।’

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা আলোচনা শান্তির পথ খুলতে পারে - শাহবাজ শরিফ : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সরাসরি আলোচনা একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথ তৈরি করতে পারে বলে। দ্য টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য-বিবৃতি বাড়লেও পাকিস্তান এখনও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘ইরান, মার্কিন প্রশাসন থেকে শুরু করে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো—সব পক্ষেরই আস্থা পাকিস্তানের ওপর রয়েছে।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জানান, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘শান্তি সহজে অর্জিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা।’

এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, দুই দেশের চলমান আলোচনা মূলত ‘বিশ্বাস সংকটে’ ভুগছে। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস না করার সব কারণই ইরানের আছে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আমেরিকানদের রয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের চলমান আলোচনা মূলত ‘বিশ্বাস সংকটে’ ভুগছে।

হরমুজ ইস্যুতে চীনের অবস্থানকে সমর্থন করবে রাশিয়া : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রেখেছে ইরান। তবে চীন এই পথ উন্মুক্ত করার জন্য স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। ওই প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেছে রাশিয়া। গতকাল রোববার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি মিখাইল উলিয়ানভ এ কথা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে উলিয়ানভ বলেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের মন্তব্যের সঙ্গে মস্কো ‘পূর্ণভাবে একমত’। ওয়াং ই বলেন, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা নিরসনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি স্থায়ী ও বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পষ্টভাবে বলেছেন, শক্তি প্রয়োগ কোনো সমস্যার সমাধান নয়, সংলাপই একমাত্র সঠিক পথ।

রাশিয়া ও চীনের এই অবস্থান এমন সময় সামনে এলো, যখন হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনও নিশ্চিত কিছু জানানো হয়নি।

ইরান ইস্যুতে আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপ : সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে ইরান সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিন এ তথ্য জানিয়েছে। গত শনিবার এক বিবৃতিতে ক্রেমলিন জানায়, দুই নেতা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন, যাতে সমঝোতার ভিত্তিতে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এ সময় পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ-সংক্রান্ত মানবিক ইস্যুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ডব্লিউএএম জানায়, দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন। তারা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।