আবার শুরু হচ্ছে যুদ্ধ
ইসরায়েলে জড়ো হচ্ছে মার্কিন বিমান
* তাদের কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না : ইরানকে ট্রাম্পের হুমকি * ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ফোনালাপে বাড়ছে ইরান যুদ্ধের শঙ্কা * আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে হামলা * ধৈর্যেরও একটা সীমা আছে, আমিরাতকে হুঁশিয়ারি দিল ইরান
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক

জার্মানিতে থাকা মার্কিন বিমান ঘাঁটি থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহনকারী কয়েক ডজন বিমান ইসরায়েলে নেমেছে। দখলদার দেশটির গণমাধ্যম চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এসব মার্কিন কার্গো বিমান তেল আবিবে অবতরণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সামরিক সরঞ্জাম ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধ পুনরায় শুরুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আনা হয়েছে বলে ধারণা। তবে কি ধরনের অস্ত্র এবং কয়টি যুদ্ধবিমান এসেছে, তা জানায়নি চ্যানেল ১৩। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি থেকে সামরিক সরঞ্জামবাহী একাধিক কার্গো বিমান দেশটিতে পৌঁছেছে। যা সেনাবাহিনীর ‘অপারেশনাল প্রস্তুতি’ জোরদারে ব্যবহৃত হবে। এদিকে, ইরানের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানও যুদ্ধ আবারও শুরু হতে পারে বলে প্রস্তুত হয়ে আছে।
তাদের কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না - ইরানকে ট্রাম্পের হুমকি : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। আর বৈঠকের এক দিন পরই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরানকে ‘দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে তাদের কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’। গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাদের খুব দ্রুত এগোতে হবে। না হলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময়টা অত্যন্ত জরুরি! প্রেসিডেন্ট ডিজেটি।’ সূত্রটির মতে, ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের গলফ ক্লাবে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
ট্রাম্প চীনে গুরুত্বপূর্ণ সফর শেষ করে ওয়াশিংটনে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশগুলোর একটি চীন। তেহরান কূটনৈতিক আলোচনা যেভাবে পরিচালনা করছে, তা নিয়ে ট্রাম্প ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা এবং এর ফলে বৈশ্বিক তেলের দামে যে প্রভাব পড়ছে, তা নিয়েও তিনি বিরক্ত বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছিল সিএনএন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি। বেইজিং সফরকালে ট্রাম্প ও তার সফরকারী দল তেহরান নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, ট্রাম্প ও চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের বৈঠকের ফলাফল দেখার পরই তারা পরবর্তী পথ নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন বলে সিএনএন আগেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। যদিও তিনি কূটনৈতিকভাবে সংঘাতের সমাধান চান, তবু যুদ্ধ শেষ করতে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করার উপায় হিসেবে সামরিক চাপ বাড়ানোর বিষয়টি তার বিবেচনায় আছে। সূত্রটি মনে করে, চলতি সপ্তাহে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প আবারও তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন। ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত আরও হামলার সিদ্ধান্ত নেন, সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু কী হতে পারে, তার একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে পেন্টাগন। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, ইরানের জ্বালানি ও অবকাঠামোগত স্থাপনাগুলোকে নিশানা করে হামলার বিষয়টিকে এই পরিকল্পনার মধ্যে রাখা হয়েছে। গত শনিবারের ওই বৈঠকের খবর প্রথম প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম এক্সিওস। গত রোববার ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলেছেন। নেতানিয়াহুর এক মুখপাত্র এবং এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য দিয়েছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে এখনও এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা পিছু হটতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ফোনালাপে বাড়ছে ইরান যুদ্ধের শঙ্কা : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন খবরের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত রোববার অনুষ্ঠিত এই আলাপে তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কোনো শান্তি চুক্তি না হওয়া এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই দুই নেতা নতুন করে যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে কথা বললেন। হিব্রু সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ফোনালাপে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানে যৌথ হামলা চালিয়েছিলেন, যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। ফলে তাদের এই সাম্প্রতিক আলাপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্তির ঘোষণা দিলেও একটি প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন কর্মকর্তারা এখন ‘অপারেশন সেøজহ্যামার’ নামে নতুন একটি ছদ্মনামে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পরপরই নেতানিয়াহু জেরুজালেমে তার কার্যালয়ে শীর্ষ সহযোগী ও মন্ত্রীদের নিয়ে একটি জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডাকেন। টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, এই ধরনের বৈঠকে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এবং শাস চেয়ারম্যান আরিয়েহ ডেরি উপস্থিত থাকেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার আগে নেতানিয়াহু তার সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেছিলেন, ইরানের বিষয়ে আমাদের চোখ খোলা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমি অবশ্যই তার চীন সফরের অভিজ্ঞতা শুনব, হয়তো অন্য কিছুও। নিশ্চিতভাবেই অনেক সম্ভাবনা রয়েছে এবং আমরা প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
মার্কিন প্রস্তাবের জবাব দিল ইরান, সংকট কি কাটবে : যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শান্তি প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানে আবারও বড় ধরনের সামরিক হামলার জোর প্রস্তুতির খবরের মধ্যেই গতকাল সোমবার তেহরান এই জবাব দেওয়ার কথা জানাল। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে এই তথ্য ও প্রস্তাবের আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের দাবিগুলোকে ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘অত্যধিক ও অযৌক্তিক’ বলে বর্ণনা করলেও কূটনীতির পথ খোলা রেখেছে তেহরান। এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আমরা গতকালই যেমনটি ঘোষণা করেছিলাম, আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো মার্কিন পক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ সংবাদ বিশ্লেষণ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করে তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই আলোচনা ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।’
১৭ মে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে একটি পাঁচ দফার তালিকা পেশ করেছে। যার মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো, ইরানকে কেবল একটিমাত্র পারমাণবিক কেন্দ্র সচল রাখতে হবে এবং তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পুরো মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এর বিপরীতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর জন্য ইরানের পক্ষ থেকেও কিছু পূর্বশর্ত দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধাবসান, ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
সংবাদ সম্মেলনে ইরানি মুখপাত্র আরও জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ কর্মপদ্ধতি তৈরির লক্ষ্যে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছেন ইরানি নেতারা। গত সপ্তাহে মাস্কটে এই বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং দুই দেশের যোগাযোগ এখনও চলছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের কোনো দেশের সঙ্গেই আমাদের শত্রুতা নেই এবং আমরা চিরকাল প্রতিবেশী হয়েই থাকব। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অঞ্চলের সব দেশকে আমরা বহিরাগত পক্ষগুলোর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’ দুই দেশের এই টানাপোড়েনের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইসলামাবাদে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমি আশাবাদী।’ এই ফলাফল নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ নতুন দফার আলোচনা আয়োজনের জন্য ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করছে বলেও তিনি জানান।
শান্তি আলোচনার এই আবহের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোনালাপ এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরুর গুঞ্জনে বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। মঙ্গলবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুম’-এ একটি জরুরি বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে হামলা, অভিযোগ ইরানের দিকে, প্রতিশোধের ইঙ্গিত : নিজেদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে হামলা ও আগুনের জন্য ইরান কিংবা ইরানের সহযোগীদের কেউ একজন দায়ী বলে মনে করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আমিরাত।
আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, গতকাল রোববার আবুধাবির আল-ধাফরা অঞ্চলে অবস্থিত বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার বাইরে একটি ড্রোন আঘাত হানে। এ ঘটনায় ওই কেন্দ্রের জেনারেটরে আগুন ধরে যায়। এ হামলায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
আমিরাতের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, আরব উপদ্বীপের প্রথম নির্মিত এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম হামলায় ব্যাহত হয়নি। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে। জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। এ বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, হামলার পেছনে ইরান কিংবা দেশটির আঞ্চলিক সহযোগীদের কেউ জড়িত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আনোয়ার আরও বলেন, ‘বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা মূল হামলাকারী কিংবা তার কোনো এজেন্টের মাধ্যমে হোক না কেন, সেটা এই এলাকার চলমান উত্তেজনা মারাত্মকভাবে বাড়াবে।’
এ হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের লঙ্ঘনের অশুভ রূপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আনোয়ার। এর পেছনে দায়ীদের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি উদাসীনতা দেখানোর অভিযোগ তোলেন তিনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠলেও সৌদি আরব এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার বিষয়টি বিশদ জানিয়েছেন। আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রোসিকে জানিয়েছেন, এমন ‘সন্ত্রাসী হামলার’ জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার তার দেশের রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে আইএইএ জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় রাফায়েল গ্রোসি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পারমাণবিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ সামরিক কার্যকলাপ পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে আঘাত হানা ড্রোনটি সেই তিনটি ড্রোনের একটি ছিল, যেগুলো পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে দেশের ভেতরে ঢুকেছে। হামলার ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। হামলার উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দুই হাজার কোটি ডলার খরচ করে বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২১ সালে এ কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিদ্যুতের মোট চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ এ কেন্দ্র পূরণ করে।
ধৈর্যেরও একটা সীমা আছে, আমিরাতকে হুঁশিয়ারি দিল ইরান : আঞ্চলিক উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। ইসরায়েলের সঙ্গে আবু ধাবির ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে সংযম দেখালেও তাদের এই ধৈর্যের একটি নির্দিষ্টসীমা রয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ইসনা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন দেশটির প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক ও ‘এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল’-এর বর্তমান সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ি।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসির) সাবেক এই শীর্ষ কমান্ডার বলেন, তেহরান এখনও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বন্ধুত্বের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। তবে আমিরাতের মনে রাখা উচিত, ইরানের ধৈর্যের দেয়াল ভেঙে পড়লে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
মোহসেন রেজায়ি সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, আমরা খুব ভালো করেই জানি যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে পর্দার আড়ালে ও প্রকাশ্যে নানা ধরনের যোগাযোগ এবং লেনদেন চলছে। তবে আমিরাতের প্রতি আমাদের পরামর্শ থাকবে- তারা যেন কোনোভাবেই ইসরায়েলের কোনো ফাঁদ বা ষড়যন্ত্রের অংশ না হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইরানের এই শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের প্রভাব বৃদ্ধির ব্যাপারে তেহরান যে কোনোভাবেই আপস করবে না, এই বার্তার মাধ্যমে আমিরাতকে সেটিই স্মরণ করিয়ে দিল ইরান।
হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনায় নতুন সংস্থার নাম ঘোষণা করল ইরান : কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নতুন সংস্থা গঠনের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের সার্বিক কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা তদারকি করতে এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে জানানো হয়, নবগঠিত এই সংস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ বা পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ। নতুন এই সংস্থাটি মূলত হরমুজ প্রণালীর যাবতীয় অপারেশন বা বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে প্রণালীর সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং এর নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের পরিবর্তন বা আপডেট তাৎক্ষণিকভাবে (রিয়েল-টাইম) প্রকাশ করবে এই কর্তৃপক্ষ। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই জ্বালানি সরবরাহ রুটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আরও জোরদার করতেই ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
