পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
২-০ ব্যবধানে বাংলাদেশের সিরিজ জয়
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এম জাফিউল ইসলাম

রাওয়ালপিন্ডি থেকে সিলেট, ২০২৪ থেকে ২০২৬। মাঝখানে কেটে গেছে ২ বছর। সময় বদলের সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছুই। শুধু বদলায়নি বিজয়ের গল্প। সেবার পাকিস্তানে গিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার দেশের মাঠে ধরা দিল একই সাফল্য। জয়ের মঞ্চ সাজানো ছিল আগের দিনই। পঞ্চম ও শেষ দিনে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২১ রান, আর বাংলাদেশের ৩ উইকেট। রাত গড়িয়ে ভোরের আলোয় কাঙ্ক্ষিত দিনের শুরু। সিলেটের আকাশে তখন উত্তেজনার ঘন মেঘ! একদিকে মোহাম্মদ রিজওয়ানের অবিচল প্রতিরোধ, অন্যদিকে বাংলাদেশের জয়ের অপেক্ষা। একটি উইকেট চাই, শুধু একটি উইকেট। সকাল থেকেই ছিল কাতর অপেক্ষা। জুটি ভাঙার সেই উইকেটই ধরা দিচ্ছিল না। পাকিস্তান ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরতে শুরু করেছিল, তখনই নাটকের মঞ্চে আবির্ভাব তাইজুল ইসলামের। এই স্পিনারের বলে উড়িয়ে মারতে গেলেন খুররম শাহজাদ। বাউন্ডারি লাইনে সহজ ক্যাচ মুঠোয় জমান তানজিদ হাসান তামিম। ভেঙে যায় পাকিস্তানের স্বপ্ন, আর তাতেই ইতিহাস গড়ে ঘরের মাঠে প্রথমবার পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ!
গতকাল বুধবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্টের শেষ দিনে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। সিরিজ জিতল ২-০ ব্যবধানে। এই নিয়ে টানা দুইবার টেস্টে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় কোন টেস্ট দল যারা পাকিস্তানকে টানা দুইবার হোয়াইটওয়াশ করল। এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। এক জায়গায় বাংলাদেশ একমাত্র। পাকিস্তানকে হোম ও অ্যাওয়েতে টেস্টে হোয়াইটওয়াশ করা একমাত্র দল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয়বার কোন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জিতল টানা চার টেস্ট। এর আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জেতার নজির ছিল। এই জয়ের ফলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে টেবিলের পাঁচে উঠে এলো বাংলাদেশ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অনেক খালি বাকি থাকলেও আপাতত ইংল্যান্ড, ভারতের উপরে থাকার আনন্দ উপভোগ করতে পারবে লাল সবুজের প্রতিনিধিরা।
৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে গত মঙ্গলবার চতুর্থ দিন শেষে ৭ উইকেটে ৩১৬ রান তুলেছিল পাকিস্তান। জয়ের জন্য শেষ দিনে আজ তাদের প্রয়োজন ছিল আরও ১২১ রান। হাতে ছিল তিন উইকেট। অন্যদিকে বাংলাদেশের দরকার ছিল মাত্র তিনটি উইকেট। তবে পঞ্চম দিনের সকালে মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খানের দৃঢ়তায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় টাইগার শিবির।
দিনের শুরু থেকেই মারকুটে ব্যাটিং করতে থাকেন পাকিস্তানের দুই ব্যাটার। দ্রুত রান তুলতে থাকায় ম্যাচে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে টি-টোয়েন্টি মেজাজে খেলতে থাকা এই জুটি বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের হয়ে সামনে আসেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ৯৬তম ওভারে তাইজুলের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ২৮ রান করে ফেরেন সাজিদ খান। অষ্টম উইকেটে রিজওয়ানের সঙ্গে তার ৫৪ রানের জুটির অবসান ঘটতেই স্বস্তি ফিরে আসে বাংলাদেশ শিবিরে। পরের ওভারেই শরিফুল ইসলামের বলে গালিতে মেহেদী হাসান মিরাজের হাতে ক্যাচ দেন ৯৪ রান করা মোহাম্মদ রিজওয়ান। ১৬৬ বলের ইনিংসে ১০টি চারে সাজানো এই প্রতিরোধমূলক ইনিংস শেষ হতেই কার্যত বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। এরপর আর বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি পাকিস্তান। শেষ ব্যাটার হিসেবে খুররাম শেহজাদকে আউট করে ইনিংসে নিজের ষষ্ঠ উইকেট পূর্ণ করেন তাইজুল ইসলাম। ৯৭.২ ওভারে ৩৫৮ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান। দ্বিতীয় ইনিংসে অসাধারণ বোলিং করে ৩৪.২ ওভারে ১২০ রান খরচায় ৬ উইকেট নেন তাইজুল। ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে তার শিকার ৯ উইকেট। এছাড়া নাহিদ রানা নেন দুটি উইকেট। শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ পান একটি করে উইকেট। এর আগে চতুর্থ দিনে পাকিস্তানের ইনিংসে শুরু থেকেই আঘাত হানে বাংলাদেশ। নাহিদ রানার বলে ৬ রান করে ফেরেন ওপেনার আব্দুল্লাহ ফজল। এরপর মিরাজের শিকার হন আজান আওয়াইস। যদিও বাবর আজম ও অধিনায়ক শান মাসুদ ৯২ রানের জুটি গড়ে পাকিস্তানকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন। তবে ৪৭ রান করা বাবরকে ফিরিয়ে সেই জুটি ভাঙেন তাইজুল। এরপর ৭১ রান করা শান মাসুদ ও সালমান আলি আগাকেও আউট করে পাকিস্তানের প্রতিরোধ ভেঙে দেন বাংলাদেশের বোলাররা।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে বড় ভূমিকা রাখেন অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। তার অনবদ্য সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ ৩৯০ রান তোলে। প্রথম ইনিংসে ৪৬ রানের লিড থাকায় পাকিস্তানের সামনে দাঁড়ায় ৪৩৭ রানের কঠিন লক্ষ্য। শেষ পর্যন্ত সেই চ্যালেঞ্জ উতরে যেতে পারেনি সফরকারীরা। পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা দুই সিরিজ জয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল বাংলাদেশ। দেশের মাটিতে ঐতিহাসিক এই হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে!
