রামপুরায় ২৮ হত্যা
‘রক্তাক্ত শরীরে সড়কে ছটফট করছিলেন আহতরা’
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর রামপুরায় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে আহতদের রক্তাক্ত শরীরে সড়কে ছটফট করতে দেখেছেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। পরে দুটি হাসপাতালে গিয়ে তিনি অন্তত সাত-আটটি লাশ দেখার কথাও বলেছেন।
রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এই সাক্ষী গত বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি দেন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া ৪৮ বছর বয়সী এই সাক্ষী খিলগাঁও থানাধীন বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সাক্ষী নিজেকে একজন ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে ট্রাইব্যুনালে বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বাইরে তিনি সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলির শব্দ শুনতে পান। আন্দোলনকারীদের ছোটাছুটি দেখে তিনিও বনশ্রী এফ-জি এভিনিউ হয়ে প্রধান সড়কে যান। ‘প্রধান সড়কে গিয়ে দেখি রামপুরা সেতুর দিক থেকে পুলিশ ও বিজিবির একটি দল থানার দিকে আসছিল। তারা ছাত্র-জনতার উদ্দেশে সাউন্ড গ্রেনেড মারছিলেন আর গুলি করছিলেন।’ গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মুখে বনশ্রীর জি ব্লকের সামনের একটি গলির ভেতরে চলে যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ৩০-৪০ মিনিট পর পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা পুনরায় রামপুরা সেতুতে আসেন। তখন এফ-জি এভিনিউয়ের কাছে মূল সড়কে কলাগাছ দিয়ে পথ আটকে দেন ছাত্র-জনতা। এই সাক্ষী বলেন, ‘এ সময় গাড়ি থেকে নেমে সড়ক থেকে এসব সরাচ্ছিল পুলিশ। আর ছাত্র-জনতার উদ্দেশে গুলি করতে করতে এভিনিউয়ের দিকে অগ্রসর হন বিজিবির সাত-আটজন সদস্য। তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুদিকে গুলি চালাতে থাকেন।’
গুলির সময় এফ ব্লকের একটি নির্মাণাধীন বাড়ির পেছনে আশ্রয় নেওয়ার কথা বলেন বনশ্রীর এই বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘তাদের গুলিতে বেশ কয়েকজন আহত হন। রক্তাক্ত শরীরে সড়কেই ছটফট করছিলেন তারা।’ পরে ফরায়েজি ও অ্যাডভান্স হাসপাতালে গিয়ে ২৫-৩০ জন গুলিবিদ্ধ মানুষের দেখা পান বলে ট্রাইব্যুনালকে বলেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, সেখানে সাত-আটজন নিহত ছিলেন, যাদের পুরো শরীর কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল। সাক্ষী বলেন, তিনি পরে জানতে পেরেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি এবং বনশ্রী এলাকায় নেতৃত্ব দেওয়া বিজিবির রেদোয়ান, মেজর রাফাত, এডিসি রাশেদুল ও ওসি মশিউরের নেতৃত্বে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে তিনি এর বিচার দাবি করেন। জুলাই আন্দোলনের সময় রামপুরায় ২৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা এ মামলায় মোট আসামি চারজন। তারা হলেন- বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম, মেজর মো. রাফাত বিন আলম মুন, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান। এর মধ্যে রেদোয়ানুল ইসলাম ও রাফাত বিন আলম গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে রয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি দুই পুলিশ কর্মকর্তা রাশেদুল ও মশিউর পলাতক। গত বছরের ২২ অক্টোবর সেনা হেফাজতে থাকা রেদোয়ান ও রাফাতকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। শুনানি শেষে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে পলাতকদের হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ওপর শুনানি শেষ করেন তখনকার প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ২১ ডিসেম্বর পলাতক দুই আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন এবং উপস্থিত দুই আসামির জন্য তাদের আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ অব্যাহতির আবেদন করেন। শুনানি শেষে গত ২৪ ডিসেম্বর এই চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের দাবি, ঘটনাস্থলে বিজিবি কর্মকর্তা রেদোয়ানুলকে আন্দোলনকারীদের ওপর ‘সরাসরি গুলি করতে দেখা যায়’।
