সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত

আদালত অবমাননার অভিযোগে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি পদক্ষেপকে ‘আদালত অবমাননা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আইনজীবী শিশির মনির। আগামী ৭ জুনের মধ্যে সরকার আপিল না করে সচিবালয় বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন চ্যালেঞ্জ করে এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশনা চেয়ে সাত আইনজীবী হাইকোর্টে যে রিট মামলা করেছেন, তাদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন শিশির মনির। গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট কোর্টের নজরে এনেছেন।

গত মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৫ কর্মকর্তা ও বিচারককে মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়। সচিবালয় বিলুপ্তির প্রক্রিয়াকে সরাসরি ‘আদালত অবমাননা’ আখ্যা দিয়ে শিশির মনির বলেন, ‘আমি মনে করি তারা যে কাজ করেছেন এটি আদালত অবমাননা হয়েছে। এই সচিবালয় স্ট্রাকচারকে তারা ডিজম্যান্টল করেছেন।

এই সচিবালয়ে যাদের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি থেকে শুরু করে ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ন্যস্ত করেছেন।’

আদালতের ইচ্ছার প্রতি ‘বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা দেখান হয়নি’ মন্তব্য করে এ আইনজীবী বলেন, ‘এই ধরনের আচরণ সিরিয়াসলি কনটেম্পচুয়াস। আমরা কনটেম্পট নোটিসও দিয়েছি। আগামীকালকেই একটি কনটেম্পট পিটিশন দায়ের করব এই ব্যাপারে।’ শিশির মনির বলেন, বিচারকদের মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি তিনি বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে এনেছেন।

‘আদালত সারপ্রাইজড হয়েছেন। সারপ্রাইজড হয়ে বারবার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেছেন যে, আপনারা আমাদের সামনে কোর্টে এসে বলেছেন কোর্টের ডিজায়ারটা সেদিন রিসিভ করেছেন। বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল নিজে হাজির ছিলেন। তাহলে এই সমস্ত কাজ কেন করছেন?’

অ্যাটর্নি জেনারেলের মৌখিক প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শিশির মনির বলেন, ‘আদালত বলেছিলেন এটি তাদের ডিজায়ার যেন এই সময়ের ভিতরে সচিবালয়কে কোনোভাবেই ডেস্ট্রয় করা না হয়। কিন্তু আদালতের সে ডিজায়ার তারা শোনেন নাই।’

সরকার ইচ্ছে করে বিচার বিভাগের সঙ্গে ‘দ্বন্দ্ব তৈরি করতে চাইছে’ মন্তব্য করে রিটকারী পক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘আইনে কোনো ত্রুটি থাকলে তা ধ্বংস না করে সবাই মিলে সংশোধন বা ফাইন-টিউনিং করা যেত। সবাই মিলে তো এটি ইমপ্রুভ করার কথা। কিন্তু আপনারা তো এটা পিছন দিকে হাঁটছেন।’

বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছিল। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও সভা-সমাবেশের মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন। সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়।

সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ গত বছর ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সররকারের অনুমোদন পায়। তার ১০ দিনের মাথায় ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়।

এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় করবে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

তবে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়। সংসদে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা এটিকে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ আখ্যা দিলেও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদেরই।

রহিতকরণের ওই আইন পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় তার আইনগত ভিত্তি হারায়। এর ফলে বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম আবার পুরোনো কাঠামোয় অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে যায়।

তারই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব (জেলা ও দায়রা জজ) শেখ আশফাকুর রহমান, দুই অতিরিক্ত সচিব শারমিন নিগার ও মোহাম্মদ হালিম উল্ল্যাহ চৌধুরী এবং সহকারী সচিব রুহুল আমীনসহ মোট ১৫ কর্মকর্তাকে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়।

ফেরত নেওয়া এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ৯ জন জেলা ও দায়রা জজ, ২ জন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, ৩ জন যুগ্ম জেলা জজ এবং একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী জেলা জজ রয়েছেন। এদিকে জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস হওয়ার পর ২০ এপ্রিল সেই আইন চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন করেন সাতজন আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয় সেখানে।

সেদিন রিটকারী পক্ষ শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাসান। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে সেদিন সিদ্ধান্ত হয়, হাইকোর্ট এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত শুনানি হবে না। এ বিষয়ে রায় হওয়া আরেকটি রিট মামলার আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অপেক্ষমান রাখা হবে।

হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ওই রায় দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সেখানে। এ বছর ৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়। হাইকোর্ট ওই রায় ঘোষণার পর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, যার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়।

২০ এপ্রিল নতুন রিট মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছিলেন, ‘(২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর) যে রায়ের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেই রায়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকৃত রায় নয়। এ কারণে নয় যে তখন বিচারপতিরা মামলার রায় দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটা সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সার্টিফিকেট দেওয়ার অর্থ হচ্ছে যে, সেটা সরাসরি আপিল বিভাগে আপিল হিসেবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।’

তিনি সেদিন বলেন, ‘এই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য, আমি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে বক্তব্য রেখেছি, বলেছি, যেহেতু ম্যাটারটা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এবং আপিলের দায়েরের প্রক্রিয়া আমাদের এই অফিসের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সুতরাং ওটা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই মামলাটার শুনানি করা উচিত হবে কি না।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আদালত নিজেও এক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন, তিনি যেহেতু এই মামলার আগের রায় প্রদানকারী বিচারপতি, যদিও বেঞ্চের এখন আরেকজন বিচারপতি পরিবর্তন হয়েছে, উনিও এ ব্যাপারে একটা, কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন।

‘আমাদের পক্ষ থেকে আমি আদালতকে বলেছি, রহিতকরণ আইনের মধ্যে বলা আছে, আরও অধিকতর যাচাই-বাছাই করা হবে। এই অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের অর্থ তো এটাও হতে পারে যে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত তারা দেখতে পারে।

‘আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি যত দ্রুত সম্ভব আমরা আগের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আমাদের আপিল দায়ের করব।’

কাজল সেদিন বলেন, ‘এখন আদালতের কাছে মামলাটি তাদের কার্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা আমাদের প্রক্রিয়া, আমাদের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের যে প্রক্রিয়া, সেটা যত দ্রুত সম্ভব আমরা সম্পন্ন করব।’

অ্যাটর্নি জেনারেলের সেই বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শিশির মনির বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন তারা ৭ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। কারণ ৭ এপ্রিলে রায় প্রকাশ হয়েছে। আপিল দায়ের করার সময়সীমা হল ৬০ দিন। এই ৬০ দিন ৭ জুনে অতিক্রান্ত হবে।

‘এই ৭ জুনের মধ্যে যদি সরকারপক্ষ আপিল দায়ের না করে সচিবালয়কে ডিজম্যান্টল করার যে কৌশল নিয়েছেন এটি তারা সম্পন্ন করেন, তাহলে ৭ জুনের পরে আমাদের হাইকোর্ট বিভাগে নতুন আইনকে চ্যালেঞ্জ করে যে রিট পিটিশন করা হয়েছে এটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা হবে।’