ট্রাম্প-নেতানিয়াহু উত্তপ্ত ফোনালাপ

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার দুই নেতার মধ্যে এক উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপে এ মতবিরোধের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এটিই এ দুই নেতার প্রথম ফোনালাপ নয়। এর আগে গত রোববারও তাঁদের মধ্যে কথা হয়। ওই কর্মকর্তা জানান, রোববারের ফোনালাপে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেই নতুন করে ইরানের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। সিএনএন এর আগের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য এ সামরিক অভিযানের নতুন নাম দেওয়া হতে পারে ‘অপারেশন সেøজহ্যামার’।

তবে প্রথম ফোনালাপের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি গত মঙ্গলবার হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর অনুরোধে হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা ও এ পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি জানান, এর পর থেকেই কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নিতে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলো হোয়াইট হাউস ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর যুক্তি হলো, হামলা বা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেরি করার অর্থ, ইরানকে শুধু বাড়তি সুবিধা দেওয়া। একটি শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার বিষয়ে কথা বলতে গতকাল বুধবার সকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘হয় আমাদের মধ্যে একটি চুক্তি হবে, না হয় আমরা এমন (কঠোর) পদক্ষেপ নেব, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। তবে আশা করছি, তেমন কিছুর প্রয়োজন হবে না।’ এদিকে চলমান এ কূটনৈতিক আলোচনা ও দর-কষাকষিতে বেশ ক্ষুব্ধ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। তেহরানের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই কঠোর ও আগ্রাসী নীতি নেওয়ার পক্ষে তাঁর অবস্থান।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর যুক্তি হলো, হামলা বা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেরি করার অর্থ, ইরানকে শুধু বাড়তি সুবিধা দেওয়া। গত মঙ্গলবারের ফোনালাপে নিজের এ অসন্তোষের কথা ট্রাম্পকে সরাসরিই জানান নেতানিয়াহু। মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পকে বলেছেন, নির্ধারিত হামলা স্থগিত করা একটি বড় ভুল ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ীই ট্রাম্পের এগিয়ে যাওয়া উচিত। এ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ইসরায়েলি একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘণ্টাব্যাপী চলা ওই ফোনালাপে নেতানিয়াহু আবারও সামরিক অভিযান শুরু করার জন্য ট্রাম্পকে চাপ দেন। ফলে দুই নেতার মধ্যকার মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি এক কর্মকর্তার ভাষায়, ট্রাম্প দেখতে চান শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো যায় কি না। কিন্তু নেতানিয়াহুর প্রত্যাশা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। এ ফোনালাপের বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন। দুই নেতার মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপের খবরটি সবার আগে প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে গত রোববার প্রথম দফার ফোনালাপের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি মঙ্গলবার হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর অনুরোধে হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ইসরায়েলের আরেকটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, মঙ্গলবারের ওই ফোনালাপের পর শুধু নেতানিয়াহুই নন, বরং তাঁর ঘনিষ্ঠ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

ওই সূত্র জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করার ব্যাপারে ইসরায়েল সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা ট্রাম্পের ওপর ক্রমাগত ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। তাঁদের মতে, ট্রাম্পের হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্তের ফলে ইরান কূটনীতির অজুহাতে শুধু সময়ক্ষেপণের সুযোগ পাচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান—বিশেষ করে ট্রাম্পের প্রথমে হুমকি দেওয়া ও পরে সুর নরম করে পিছু হটা নিয়ে নেতানিয়াহুর ক্ষোভ একেবারে নতুন নয় বলে জানিয়েছে দুই নেতার আলাপচারিতা সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো। মার্কিন কর্মকর্তারাও অতীতে স্বীকার করেছেন, এ যুদ্ধের লক্ষ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে।

গতকাল সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, আগের রাতে ফোনালাপে তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কী কথা বলেছেন। জবাবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এখন তাঁর নিজের হাতেই। তিনি সরাসরি বলেন, ‘আমি যা চাইব, তিনি (নেতানিয়াহু) তাই করবেন।’

হরমুজে জাহাজ চলাচলে নতুন শর্ত আরোপ করল ইরান : বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে যাতায়াতকারী সব বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী জাহাজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইরান। এখন থেকে এ কৌশলগত জলপথের ইরানি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা দিয়ে যেকোনো জাহাজ পারাপারের ক্ষেত্রে দেশটির নবগঠিত নৌ-কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি এবং সমন্বয় রক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গত বুধবার এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ইরানি কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, প্রণালির নির্ধারিত এলাকাগুলো ব্যবহারের জন্য এখন থেকে বিশেষ পারমিট বা লাইসেন্স নেওয়া অবশই করণীয়। একই সঙ্গে ইরান এ নতুন নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলের আওতাভুক্ত এলাকার বিবরণ ও একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে।

ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানের কেশম দ্বীপ থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল-কুয়াইন পর্যন্ত এবং জাবাল মুবারক থেকে ফুজাইরাহর দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত জলসীমা এই নতুন নজরদারি জোনের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ইরানি লাইসেন্সিং ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তেহরানের দাবি, পারস্য উপসাগরের এ সমুদ্রসীমায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং নৌ-চলাচলের শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই এ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। হরমুজ প্রণালী হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধমনী, যার ওপর পুরো বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা নির্ভরশীল। ইরানের এ আকস্মিক ও একতরফা পদক্ষেপের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা ও তেলের দাম চড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হামলার হুমকির মধ্যেই মার্কিন প্রস্তাব যাচাই করছে তেহরান : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো সর্বশেষ প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে ইরান। দুপক্ষই নতুন করে হামলা শুরু করার বিষয়ে একে অপরকে হুমকি দিয়ে যাওয়ার মধ্যেই গত বুধবার তেহরানের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে আলোচনার ‘একেবারে শেষ পর্যায়ে’ রয়েছে।

হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, আমাদের মধ্যে হয়তো একটি চুক্তি হবে, না হলে আমরা এমন কিছু করতে যাচ্ছি, যা একটু অপ্রীতিকর হবে। তবে আশা করি তেমন কিছু ঘটবে না। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘাই জানান, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান আমেরিকান পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রস্তাবগুলো পেয়েছে। আমরা বর্তমানে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি। তবে আলোচনার মধ্যেই মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ইরানের মূল দাবিগুলোর কথা আবারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে বিদেশে অবরুদ্ধ থাকা ইরানি সম্পদ অবিলম্বে মুক্ত করা এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধের অবসান ঘটানো।

বল প্রয়োগে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চিন্তা নিছক কল্পনা -প্রেসিডেন্ট : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা কেবলই এক ধরনের বিভ্রম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের পোস্টে একথা লিখেন তিনি। পোস্টে তিনি লিখেন, ইরান সবসময় তার সব অঙ্গীকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকেছে এবং যুদ্ধ এড়ানোর সব পথও পরীক্ষা করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে সব পথ এখনও খোলা রয়েছে। জোর করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চিন্তা নিছকই একটি ভ্রান্ত ধারণা। খবর প্রেস টুডে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পরিচালিত কূটনীতি যুদ্ধের তুলনায় কম ব্যয়বহুল, অধিক যুক্তিসঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী। আর ইরান বহু বছর ধরেই এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে আসছে।

আত্মসমর্পণ নয়, নতুন উন্নত অস্ত্রে ‘সংযমহীন’ জবাবের হুমকি ইরানের : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নতুন করা হামলার শুরু করলে তার জবাব হবে ব্যাপক ও কড়া। তারা প্রয়োজনে এমন অস্ত্র ব্যবহার করবে আগে কখনোই মোতায়েন করা হয়নি এবং পরীক্ষাও করা হয়নি। এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। পাশাপাশি দেশটি বলেছে, আলোচনার দরজা খোলা; কিন্তু আত্মসমপর্ণের কোনো সুযোগ নেই। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন আবার চালানো হলে প্রতিশ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধ এবার অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হবে।’ এর আগে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ শান্তি আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক অডিও বার্তায় বলেন, ‘শত্রুর প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা’ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তারা নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, তেহরান এখনো আলোচনার জন্য উন্মুক্ত।

এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘তবে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার ধারণা নিছক বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।’ অপর দিকে, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না বলে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমরা ইরান ইস্যুর শেষ পর্যায়ে আছি। দেখা যাক, কী হয়। হয় একটি চুক্তি হবে, নয়তো আমরা কিছুটা কঠোর পদক্ষেপ নেব। যদিও আশা করি সেটা লাগবে না।’ দিনের শুরুতে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘আদর্শিকভাবে আমি চাই কম মানুষ মারা যাক, অনেকের বদলে। আমরা দুভাবেই এটা করতে পারি।’ একই দিনে ট্রাম্প তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন। আঙ্কারা জানায়, এরদোয়ান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ট্রাম্পকে বলেছেন, তিনি মনে করেন একটি ‘যৌক্তিক সমাধান’ সম্ভব।

ট্রাম্পের বারবার হুমকির বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের নীরব থাকা উচিত নয় -ইরান : জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার হুমকির বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের নীরব বা উদাসীন থাকা উচিত নয়।

ইরনার বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি বুধবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা বিষয়ক বৈঠকে বলেছেন, ‘বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা কেবল একটি মানবিক বিষয় নয় বরং এটি আন্তর্জাতিক আইন, জেনেভা কনভেনশন এবং জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী একটি বাধ্যতামূলক আইনি বাধ্যবাধকতা।’ ইরাভানি আরও বলেন, ‘তবে, বর্তমানে বেসামরিক নাগরিকরা ক্রমবর্ধমানভাবে ইচ্ছাকৃত সামরিক হামলা, গণশাস্তির শিকার হচ্ছেন এবং বেসামরিক অবকাঠামো পরিকল্পিত ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এই দুঃখজনক বাস্তবতা গাজা থেকে লেবানন পর্যন্ত এবং অতি সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধে স্পষ্ট হয়েছে।’

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আগ্রাসী কর্মকাণ্ড এই তিক্ত বাস্তবতাকে আবারও উন্মোচিত করেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন: এই অন্যায্য ও নৃশংস যুদ্ধের চল্লিশ দিনে আগ্রাসনকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যবশত, নিরাপত্তা পরিষদ এই আইন লঙ্ঘনের মুখে তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

ধারণার চেয়েও দ্রুত সামরিক সক্ষমতা ও ড্রোন উৎপাদন বাড়াচ্ছে ইরান : গত এপ্রিলের শুরুতে শুরু হওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরান এরমধ্যেই তাদের ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানায় সংবাদমাধ্যমটি। প্রতিবেদনে আরও চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী- ইরানের সামরিক বাহিনী প্রাথমিক ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে নিজেদের সামরিক শিল্প খাত ও ঘাঁটিগুলো পুনর্গঠন করছে।

৬ মাসেই ফিরতে পারে পূর্ণ সক্ষমতা : অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির সময়সীমা ভিন্ন হলেও একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, গোয়েন্দা হিসাব অনুযায়ী, ইরান আগামী ছয় মাসের মধ্যেই তাদের ড্রোন হামলার পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে পেতে পারে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে মার্কিন গোয়েন্দা কমিউনিটির দেওয়া সব সময়সীমা পার করে গেছে ইরানিরা।’

যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইরান তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে বিপুল পরিমাণ ড্রোন ব্যবহার করতে পারে, যা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম।

নেপথ্যে রাশিয়া ও চীনের সমর্থন : একটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে কম ক্ষয়ক্ষতি হওয়া এবং রাশিয়া ও চীনের পরোক্ষ সমর্থনের কারণে ইরান এত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারছে। সূত্রমতে, সংঘাতের মধ্যেও চীন ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে গেছে, যা বর্তমানে মার্কিন ব্লকেডের কারণে কিছুটা সীমিত।

গত সপ্তাহে সিবিএস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, চীন ইরানকে ‘ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপাদান’ দিচ্ছে। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

পেন্টাগন ও সেন্টকমের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য : এদিকে মার্কিন সামরিক মহলে ইরানের এই পুনর্গঠন নিয়ে স্পষ্ট মতবিরোধ দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ধ্বংস করেছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প ঘাঁটির ৯০ শতাংশই গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যা পুনর্গঠন করতে কয়েক বছর লেগে যাবে।

অক্ষত রয়েছে অর্ধেক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার : মার্কিন গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আগের চেয়ে বেশি অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এখনও অক্ষত রয়েছে। যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরানিরা মাটির নিচে বা ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা লঞ্চারগুলো খনন করে বের করার সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়া ইরানের ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ এখনও সম্পূর্ণ অক্ষত। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হিসেবে পরিচিত ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশও ধ্বংস করা যায়নি। সামগ্রিকভাবে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত করছে যে, যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করলেও তা একেবারে ধ্বংস করতে পারেনি এবং তেহরান অত্যন্ত কার্যকরভাবে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কাটিয়ে উঠছে।