ফুঁসছে দেশ, সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্লবীতে চাঞ্চল্যকর রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। এমন জঘন্যতম নৃশংসতার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। এরই ধারাবাহিকতায় পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ করে অপরাধীর দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভ করে সহপাঠী এবং এলাকাবাসী। এ সময় দ্রুত বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানান তারা।
এলাকাবাসী হত্যার দ্রুত বিচারের বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে থানায় যান। এ সময় থানা পুলিশ এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার কথা বলেন। রামিসার বাসায় সরেজমিন দেখা যায়, এলাকাবাসী নিজেদের সন্তানের নিয়ে নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন। তারা বলেন, ঘরে-বাইরে কোনো নিরাপত্তা নেই। শিশুদের সঙ্গে নির্মমতার কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
এর আগে, গত মঙ্গলবার সকালে মিরপুর-১১ এলাকার বি ব্লকের একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, শিশুটি হত্যার পর লাশ গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যদিও ফ্ল্যাটের ভেতর থেকেই দেহের অংশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬)।
এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ আইনমন্ত্রীর : রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনায় বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা না গেলে সমাজে ‘খারাপ বার্তা’ যাবে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এই অবস্থানের কথা জানান। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কষ্টের কথা, খুবই কষ্টের কথা। আমাদের পক্ষ থেকে এই বিচারের প্রক্রিয়াটাকে সামনের দিকে দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য যা কিছু করা সম্ভব, আমরা সবকিছু করব।’ আসাদুজ্জামান বলেন, আমি আজ অফিসে এসে প্রথম যে কাজটা করেছি, পুলিশ কমিশনারকে টেলিফোন করে বলেছি, এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন, যতটা দ্রুত সম্ভব, এক সপ্তাহের মধ্যে করার ব্যবস্থা করেন। উনি আমার সাথে একমত হয়েছেন। একটু আগে আমার সাথে স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
‘রামিসার বাবার জবাব, উনি যে হতাশা ব্যক্ত করেছেন— সেটার একমাত্র উত্তর হবে, যদি আমরা এ বিচার প্রক্রিয়াটাকে প্রত্যাশিতভাবে অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে পারি। সেটাই হবে আমাদের জবাব।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘রামিসার যে ঘটনাটি ঘটেছে, এটি আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, দুঃখজনক এবং এটি একটি ঘুণে ধরা সমাজের দৃষ্টান্ত। মাগুরার আছিয়াই হোক কিংবা ঢাকার রামিসাই হোক- সবকিছুই কিন্তু আমাদের মনুষ্যত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের কঠোর মনোভাবের কথা স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘এমন অপরাধ আমরা কোনোভাবেই আনচ্যালেঞ্জড হতে দেব না। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য আমাদের যা কিছু করার প্রয়োজন, আমরা তার সবটুকু করব।’
দ্রুত বিচারের বিষয়ে নজির টেনে আসাদুজ্জামান বলেন, এর আগে মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলায় আমরা রেকর্ড ৭ দিনের মধ্যে চার্জশিট দিয়েছিলাম এবং মাত্র ১ মাসের মধ্যে ট্রায়াল বা বিচারকাজ শেষ হয়েছিল।
‘মামলার গুরুত্ব অনুধাবন করে বিচার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া উচিত। আমি আশা করি, রামিসার ঘটনার বিচারও আমরা একইভাবে দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে পারব।’ মামলাটির বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বিচার কার্যকর করা সুপ্রিম কোর্টের এবং আদালতের এখতিয়ার, আমরা বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারি না। ‘তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যেন এই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে প্রয়োজনীয় সমস্ত সহযোগিতা ও যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের চলমান প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে ব্রিফিংয়ে আইনমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, ‘রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই ধর্ষণ বা এ জাতীয় গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলা বিবেচনা করা হবে না। এই বিষয়ে কোনো আপস নেই।’ গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি এরইমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় ধর্ষণের পর হত্যার ‘স্বীকারোক্তি’ দিয়েছেন বলে পুলিশের ভাষ্য।
পল্লবীতে শিশুহত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে - স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোহেল আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। বিচারের দায়িত্ব আদালতের।’
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিচারহীনতার কথা মানুষ সব সময় বলে থাকে, তবে তা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচার বিলম্বিত হয় বলে মানুষ মনে করে বিচার পাবে না। কিন্তু এই ধরনের অপরাধে দ্রুত আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই ঘটনায়ও সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে।’ এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, ওই দিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল (৩২) শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেন। পরে মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে দেন। হত্যাকাণ্ডের পর ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে পালিয়ে যান তিনি। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার বাসার ভেতরেই ছিলেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেলকে আটক করা হয়। এই ঘটনায় শিশুর বাবা সোহেল ও স্বপ্নাকে আসামি করে একই দিন পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত ওই শিশু। সে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। একই ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন সোহেল ও স্বপ্না। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ওই শিশু বাসা থেকে বের হলে কৌশলে তাকে তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে নিয়ে যান আসামিরা। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজির সময় আসামিদের বাড়ির সামনে শিশুর স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে ভবনের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন তারা। ঘরে ঢুকে খাটের নিচে শিশুর মাথাবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে তার কাটা মাথা দেখতে পান স্বজনরা। ওই সময় ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বপ্না আক্তার। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না জানিয়েছেন, তার স্বামী সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে আটকে ধর্ষণ করার পর মেরে ফেলেন। পরে লাশ গায়েব করার জন্য ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে ফেলেন। কাঁধ থেকে দুই হাত বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর লাশ খাটের নিচে রেখে কাটা মাথা বাথরুমের বালতিতে রাখা হয়। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান সোহেল।
বিচার দ্রুত হলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে - অ্যাটর্নি জেনারেল : নির্মম ঘটনার বিচার যত দ্রুত হবে, বিচারব্যবস্থার প্রতি দেশের মানুষের আস্থা ততো ফিরে আসবে বলে উল্লেখ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
