অস্থির মসলার বাজার

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

আয় বাড়েনি; কিন্তু উৎসবের আগে খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। অথচ ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়ে বাজারে এখন বইছে নিত্যপণ্যের চড়া দামের আগুন। এলাচ, জিরা, আদা-রসুনসহ সব ধরনের মসলা থেকে শুরু করে পোলাওয়ের চাল, তেল ও সেমাই কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্তের পকেট ফাঁকা হওয়ার উপক্রম। উৎসবের আগে বাজার মনিটরিং জোরদার না হলে এই ভোগান্তি আরও চরম আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা সাধারণ ক্রেতাদের।

কোরবানির ঈদ মানেই রান্নাঘরে মসলার ছড়াছড়ি, আর সেই সুবাসে ভরে ওঠে উৎসবের আবহ। কিন্তু এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। মসলা ছাড়া ঈদের রান্না কল্পনা করা গেলেও, বাজারে মসলার দামের আগুনে ক্রেতাদের হিসাব-নিকাশ এখন এলোমেলো।

কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের মসলার দাম বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। ঈদের আনন্দের আগে তাই মসলার বাজারেই এখন অস্থিরতার ছায়া।

এলাচ বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। লবঙ্গ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, জিরা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, দারুচিনি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ধনিয়ার গুঁড়া ৩০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আদা, রসুন ও পেঁয়াজের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

এছাড়াও, রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। ঈদকে কেন্দ্র করে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা, আর সেই সুযোগে দাম বেড়েছে বিভিন্ন পণ্যের দাম।

বিশেষ করে পোলাও চাল, মসলা, ভোজ্যতেল, সালাদের উপকরণ ও শুকনো খাদ্যপণ্যের বাজারে এখন ঊর্ধ্বমুখী দামের চাপ স্পষ্ট। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, মৌসুমি চাহিদা বাড়ার কারণেই বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে মুরগি ও ডিমের বাজারে, যেখানে আগের তুলনায় দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রাণিজ পণ্যের দামে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। ব্রয়লার মুরগি বর্তমানে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়, যা কয়েক দিন আগেও ১৯০ টাকার ওপরে ছিল। একইভাবে কমেছে সোনালি জাতের মুরগির দাম। এ জাতের মুরগি এখন কেজি প্রতি ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি মুরগির দাম রয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, ডজন প্রতি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায়। গত এক সপ্তাহের তুলনায় ডিমের দামে ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি কেজিতে প্রায় ১০ টাকা কমেছে। তবে গরুর মাংস এখনও কেজি প্রতি ৮০০ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় এসব পণ্যের দামে এই পরিবর্তন দেখা গেছে।

রায়সাহেব বাজারে মুরগি কিনতে আসা মাশরাফি হাসান বলেন, ‘কয়েকদিন আগে ২০০ টাকা কেজি দরে কিনেছিলাম। আজ ১৮০ টাকায় পেলাম। কিছুটা স্বস্তি লাগছে।’

মুরগি বিক্রেতা আনিসুর রহমান বলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় সরবরাহ বেশি রয়েছে, তাই মুরগির দাম কিছুটা কমেছে।’ তবে ঈদের প্রধান অনুষঙ্গ পোলাও চালের বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বর্তমানে মানভেদে পোলাও চাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, যা কিছুদিন আগেও ছিল ১৩০ টাকার মধ্যে। একইভাবে চিনিগুঁড়া চালের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায় এবং খোলা সুগন্ধি চাল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ঈদ উপলক্ষে সেমাই ও নুডুলসের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজারে ২০০ গ্রাম প্যাকেট সেমাই ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ৮০০ গ্রাম বোম্বাই সেমাই ২৮০ টাকা এবং খোলা লাচ্ছা সেমাই ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নুডুলসের দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।

এদিকে সালাদের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত শসা, টমেটো, লেবু ও কাঁচামরিচের বাজারেও চাপ দেখা গেছে। বর্তমানে শসা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি, টমেটো ৮০ থেকে ৯০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। তবে লেবুর বাজারে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ২০ থেকে ৩০ টাকায় এক হালি লেবু বিক্রি হতে দেখা গেছে।

ভোজ্যতেলের বাজারেও চলছে অস্থিরতা। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। অনেক দোকানে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কম থাকায় ক্রেতাদের বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। বোতলের গায়ে লেখা দামের চেয়ে লিটার প্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ সংকটের কারণেই তেলের বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে।

বিক্রেতারা জানান, ঈদকে সামনে রেখে বাজারে ক্রেতার চাপ বেড়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে। বিশেষ করে পোলাওয়ের চাল, মসলা, তেল, সেমাই ও শুকনো খাদ্যপণ্যের পাইকারি দাম কয়েকদিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে খুচরা বাজারেও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। তাদের মতে, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চাপের কারণেই বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুব আলম বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে পরিবারের জন্য বাজার করতে এসেছি। কিন্তু বাজারে এসে দেখি প্রায় সব জিনিসের দামই আগের চেয়ে অনেক বেশি। পোলাওয়ের চাল, তেল, মসলা, সেমাই, নুডুলস—যেটাই কিনতে যাচ্ছি, দাম শুনে হিসাব মিলাতে কষ্ট হচ্ছে। একেকটা পণ্যে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ঈদের বাজার করা এখন অনেক কঠিন হয়ে গেছে। বাজার মনিটরিং ঠিকভাবে হলে হয়তো সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতো।’

অন্যদিকে সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। অধিকাংশ সবজি বর্তমানে ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। কেজি প্রতি করলা ৮০ টাকা, গোল বেগুন ১০০ টাকা, লম্বা বেগুন ৭০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, টমেটো ৮০ থেকে ৯০ টাকা, পটল ও ঝিঙ্গা ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া বরবটি, পেঁপে, চিচিঙ্গা ও ধুন্দুল- সবই কেজি প্রতি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ প্রতি পিস ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচা কলা প্রতি হালি ৬০ টাকা, জালি প্রতি পিস ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়া কেজি প্রতি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঁচা মরিচের দাম এখনও তুলনামূলক বেশি। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়।

রায়সাহেব বাজারে বাজার করতে আসা শিহাবুল ইসলাম বলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম কিছুটা কমেছে। তবে এখনও সাধারণ মানুষের জন্য দাম বেশি। বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা দরকার।’ নারিন্দা বাজারের বিক্রেতা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘ঈদের সময় পরিবহন সংকট ও যানজটের কারণে সরবরাহ কমে গেলে আবারও সবজির দাম বাড়তে পারে।’

এদিকে মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায় সেখানেও দাম চড়া। প্রতি কেজি পাঙাশ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৩০, রুই ২৪০ থেকে ৩৫০, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০, দেশি টেংরা ৬০০, বেলে ৩৫০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০, চিংড়ি ৯০০, পাবদা ৩৫০, কই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা, সইল ৭০০ টাকা, টাকি ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে চিংড়ির দাম বেশি দেখা গেছে। আকার ও জাতভেদে প্রতি কেজিতে খরচ করতে হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৯০০ টাকা। এ ছাড়া ১ কেজি সাইজের ইলিশ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।

পাশাপাশি ছোট জাটকা সাইজের ইলিশ (২০০ গ্রাম সাইজের ছোট মাছ) বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০০ টাকায়। ইলিশের দাম সাইজের উপর নির্ভর করছে বলে জানান বিক্রেতারা।

মাছ বিক্রেতারা বলেন, ঈদকে সামনে রেখে বাজারে মাছের চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি নদী ও খামার থেকে সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় বেশিরভাগ মাছের দাম বাড়তি। বিশেষ করে ইলিশ, চিংড়ি ও দেশি মাছের দাম বেশি।

মাছ কিনতে আসা রেজাউল করিম বলেন, ‘ঈদের আগে মাছের বাজারে এসে দেখি প্রায় সব মাছের দামই অনেক বেশি। পরিবার নিয়ে ভালো কিছু খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাজেটের কারণে অনেক সময় কম দামের মাছেই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে।’

বাজার করতে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রতি ঈদের আগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজার অস্থির করে তোলে। তাদের দাবি, কার্যকর বাজার মনিটরিং ও কঠোর নজরদারি না থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে থাকে।