ঢাকা সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’ খুলছে হরমুজ প্রণালী

ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’ খুলছে হরমুজ প্রণালী

ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে সমঝোতা ‘প্রায় চূড়ান্ত’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শিগগিরই চুক্তির বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি। গত শনিবার ট্রাম্প বলেন, এ চুক্তির মধ্যে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ নিয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি তিনি। ট্রাম্পের এ বক্তব্যের আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি এসেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর অর্থ এ নয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়ে গেছে। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘পরস্পরবিরোধী বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগও তোলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘শান্তি-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক’ নিয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গে তাঁর ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের মধ্যে একটি চুক্তি নিয়ে বেশির ভাগ আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে; এখন শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন ও সমাপ্তি হওয়া বাকি।’

বর্তমানে চুক্তির চূড়ান্ত দিক ও বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে এবং খুব শিগগির তা ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে এবং ফোনালাপ ‘খুব ভালোভাবে’ সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

সম্ভাব্য চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য না দিলেও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো চুক্তিই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ‘অবশ্যই’ বিরত রাখবে। পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার অসাধারণ প্রচেষ্টার জন্য আমি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানাই।’ তাঁদের (ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু) ফোনালাপ ‘খুব ফলপ্রসূ ও কার্যকর’ হয়েছে বলেও জানান শাহবাজ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ শান্তি চুক্তি আলোচনায় পাকিস্তান সহায়তা করছে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে শাহবাজ লেখেন, ‘আমরা খুব শিগগির পরবর্তী দফার আলোচনা আয়োজনের আশা করছি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা শুরু করে। জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও ইসরায়েলে হামলা চালায়। পাল্টাপাল্টি এ হামলার জেরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এপ্রিলের শুরুতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়, যা এখনো চলছে। যুদ্ধবিরতির পর থেকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছে।

গতকাল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কথা বলতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই একটি ‘সমঝোতা স্মারক’-এর কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইরানের লক্ষ্য, একটি চুক্তিতে পৌঁছানো; যা ১৪টি পয়েন্ট নিয়ে গঠিত একটি কাঠামোর আকারে হবে।

বাঘাই বলেন, তাঁরা বর্তমানে ওই সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় আছেন। শেষ পর্যন্ত একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

‘এই চুক্তি খারাপ’, ট্রাম্প ও ইরান সমঝোতা নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা। দেশটির সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ নিউজকে তিনি বলেছেন, যে চুক্তিটি সামনে আসছে তা অত্যন্ত খারাপ। ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এ খবর জানিয়েছে।

ইসরায়েলি ওই কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তির যে রূপরেখা বা কাঠামো দেখা যাচ্ছে, তা তেহরানকে এই বার্তাই দেয় যে তারা হরমুজ প্রণালীকে এমন একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা কোনও পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে কম কার্যকর নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইসরায়েলি কর্মকর্তা আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন এই চুক্তিটির মূলভিত্তি হবে অর্থনৈতিক। এর ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনও ছাড় দেওয়ার ওপর নির্ভর না করেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি উন্মুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। সংবাদমাধ্যমটিকে ওই কর্মকর্তা জানান, সম্ভাব্য এই চুক্তির প্রথম ধাপ বা প্রথম পর্বের পর আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

চুক্তিতে ইরান যা চায় তা-ই পাচ্ছে : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ও চলমান উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, বর্তমান খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী ইরান কার্যত তার মূল কৌশলগত দাবিগুলোর বড় একটি অংশই অর্জন করতে যাচ্ছে। ইজাদির মতে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কাঠামোয় সবচেয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর দিক হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি। তার ভাষায়, এটি কার্যত ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ শিথিল করার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প তার সমঝোতায় মূলত একটিই বিষয় স্পষ্টভাবে বলেছেন- হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া। এর অর্থ দাঁড়ায়, ইরানের ওপর থাকা নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। কারণ, মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকাকালে ইরান নিজে থেকে প্রণালী খুলবে না।’

ইজাদি আরও উল্লেখ করেন, এর আগে ট্রাম্প ইরানের তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, কিন্তু সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই বিষয়টির কোনও উল্লেখ নেই। তার মতে, এটি আলোচনার অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা হলো ইরান তার বহুদিনের কৌশলগত অবস্থান থেকে সুবিধা পাচ্ছে।

ইজাদি আরও দাবি করেন, ইরান কখনওই এই যুদ্ধ শুরু করতে চায়নি এবং হরমুজ প্রণালী বা নিজস্ব বন্দরের ওপর অবরোধ আরোপের পক্ষেও ছিল না। তাই অবরোধ প্রত্যাহার হলে সেটি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হবে। তিনি আরও বলেন, “ইরান তার দেশের প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ ফেরত পাচ্ছে এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ইরানের জন্য ইতিবাচকই বলা যায়।”

বিশ্লেষক মহলে অবশ্য এই মন্তব্য ঘিরে ভিন্নমতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, চূড়ান্ত সমঝোতা এখনও অনিশ্চিত এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। তবে ইজাদির মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান কূটনৈতিক সমীকরণে ইরানের অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হিসেবে তুলে ধরছে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত