
পল্লবী এলাকায় শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে গত রোববার দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্র দাখিল করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবুল কালাম আজাদ তথ্যটি নিশ্চিত করেন। এদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান জানান, সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর মৃত্যুর সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বিকালে ঢাকার মহানগর হাকিম আশরাফুল হক আদালত আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র দেখে তা বদলির আদেশ দেন। পরে তাদের মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে বদলির করা হয়েছে। মামলায় ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। এর আগে, গত মঙ্গলবার দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন। পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যান।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পান। এসময় স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, ‘রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে লাশ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান’।
রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনায় আইনজীবী হিসেবে শনিবার আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। পরবর্তীতে মামলাটি বিচারের জন্য মামলাটি শিশু অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে।
রামিসা হত্যা মামলার বিচার ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হবে - স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে শেষ হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রামিসা হত্যা মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। গতকাল রোববার সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপে’ তিনি এসব কথা বলেন।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হক। এতে উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর পালিয়ে যাওয়া আসামিকে সাত ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামি একদিনের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সহযোগী অপরাধী হিসেবে তার স্ত্রীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দ্রুত আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করিয়েছি। সেই টেস্ট তিন দিনের সময় লাগে, তিন দিনের মধ্যে সেটা সমাপ্ত হয়েছে। রিপোর্ট কালকে বিকেলে জমা দেওয়া হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা এরই মধ্যে আমরা হাতে পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, এগুলো সব একসঙ্গে করে, কম্পাইল করে চার্জশিট প্রণয়নের কাজটা কাল রাতের মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। আজ আদালতে সেটা দাখিল করা হবে, হয়তো এরই মধ্যে হয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আদালতের ছুটি থাকলেও এ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ আদালতের ছুটি চিফ জাস্টিস বাতিল করার চিন্তা করছেন; এটা আইন মন্ত্রণালয় ডিল করছে। তিনি বলেন, শুধু এই মামলাটি ডিল করার জন্য আমরা একজন স্পেশাল পিপি নিয়োগ করেছি। সবকিছু বিবেচনায় আমরা আশা করছি যে আজকের মধ্যেই চার্জশিট দেওয়া হবে এবং খুব সম্ভবত পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে এই বিচার সমাপ্ত হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত আসামিদের যাতে গ্রেপ্তার করা যায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, সরকার হিসেবে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা এবং বিচারের ব্যবস্থাটা নিশ্চিত করছি। আমরা সবচেয়ে মনোযোগ এখানেই দিয়েছি যে দ্রুততম সময়ে যাতে অভিযুক্ত বা অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়। সেই জায়গায় এই তিন মাসে প্রত্যেকটি ঘটনায় আমরা সফল হয়েছি। আর ভবিষ্যতেও আমরা এ ধরনের যেকোনো ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত বা অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
ফরেনসিক প্রতিবেদনে উঠে এলো গা শিউরে ওঠা তথ্য : রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু রামিসা আক্তারকে (৭) হত্যার আগে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছে ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রোফাইলিং প্রতিবেদন। ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাই রামিসাকে পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে। গত শনিবার সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এই ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, সরকারের বিশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী আজ রোববার (২৪ মে) বিকেলের মধ্যেই আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়ার জোর প্রস্তুতি চলছে। খসড়া তৈরি শেষে বর্তমানে সিডিএমএস (ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) সফটওয়্যারে ডেটা এন্ট্রি করাসহ কিছু কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে পুলিশ। এই দ্রুততম সময়ে দাখিল হতে যাওয়া চার্জশিটে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
এর আগে গত বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন প্রধান আসামি সোহেল রানা। জবানবন্দিতে তিনি স্বীকার করেন যে, ঘটনার পূর্বে তিনি ইয়াবা সেবন করেছিলেন এবং এরপরই শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
এদিকে দেশ কাঁপানো এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে শেষ করতে স্বয়ং আইন মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিচালনার জন্য অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান স্পষ্ট করেছেন যে, আসন্ন ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পরপরই এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হবে।
গত ১৯ মে পল্লবীর একটি বাসায় পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার এই বর্বরোচিত ঘটনায় সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো টানা আন্দোলন ও বিক্ষোভ চলছে।
ঘটনার পরদিনই নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ দ্রুততম সময়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এরমধ্যেই বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিহত রামিসার বাসায় গিয়ে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত¡না দিয়েছেন এবং আগামী ১ মাসের মধ্যে এই পৈশাচিক অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।