ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি এখনই হচ্ছে না

* সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না : পেজেশকিয়ান * আলোচনা ব্যর্থ হলে ‘অন্য পথ’ খুঁজবে যুক্তরাষ্ট্র : রুবিও * হরমুজ পেরিয়ে চীন ও পাকিস্তানের পথে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিবাহী ট্যাংকার

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনায় অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেলেও এর মানে এই নয় যে তেহরান একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি আছে।গতকাল সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেন, চলমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসি যুদ্ধের অবসান। এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত করতে কোনো সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি।

আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবির প্রতিক্রিয়ায় বাকায়ি জানান, গত কয়েকদিনে যে অগ্রগতির খবর এসেছে তা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া গত কয়েক সপ্তাহের আলোচনার ফল। ইরান যুদ্ধ অবসানের জন্য আলোচনা করলেও এখন পারমাণবিক বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা করছে না বলে জানান তিনি, খবর রয়টার্সের। মার্কিন কর্মকর্তাদের অবস্থানের পরিবর্তন হলে যে কোনো চুক্তির জন্য সমস্যা তৈরি হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পদত্যাগের ঢেউ, কংগ্রেসের বিরোধিতা, জনমত ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চাপের দিকে ইঙ্গিত করেন। এ পরিস্থিতি জায়নবাদী শাসনসহ নির্দিষ্ট কিছু পক্ষের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে বলে অনুযোগ করেন তিনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ইরানি জাতির অধিকার সুরক্ষিত করে এমন একটি সমাধানে পৌঁছতে তেহরান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তেহরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। তিনি জানান, এমন বিষয় রক্ষা করে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। এই পর্যায়ে ইরান পারমাণবিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছে না আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৪ অনুচ্ছেদের সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর দিকেই মনোযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর আগে ভারতের নয়া দিল্লিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে হয় একটি ভালো চুক্তি করবে অথবা দেশটিকে মোকাবেলায় ‘অন্য পথ’ খুঁজে বের করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিকল্প পথ’ খোঁজার আগে কূটনীতিকে সফল করার সবরকম সুযোগ দেবে। গত শনিবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে, কেবল ঘোষণার অপেক্ষা। কিন্তু গত রোববার ট্রাম্প আলোচনার দায়িত্বে থাকা মার্কিন প্রতিনিধিদলকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করা নিয়ে কোনও তাড়াহুড়া না করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য সব সিদ্ধান্তই সর্বোচ্চ নেতার সম্মতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নেওয়া হবে।’ এক বিবৃতিতে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘দেশ পরিচালনায় সমঝোতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও সম্মিলিত শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে এমন কোনো বক্তব্য, বিশ্লেষণ বা অবস্থান মূলত শত্রুপক্ষের উদ্দেশ্যকেই শক্তিশালী করে।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট জানান, দেশটি বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে প্রস্তুত যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে না। তিনি বলেন, ‘ইরানের আলোচক দল দেশের সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করবে না।’ এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক প্রতিবেদনে বলছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে গোপন একটি স্থানে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অবস্থান করছেন। বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তার যোগাযোগ খুবই সীমিত। গত রোববার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছে পৌঁছাতে জটিল বার্তাবাহক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা ইরানি কর্মকর্তারাও নিজেদের সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে সহজে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এ কারণেই আলোচনা এগোতে দেরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো প্রস্তাব পাঠায়, তখন সেই বার্তা সর্বোচ্চ নেতার কাছে পৌঁছাতে এবং সেখান থেকে উত্তর আসতে অনেক সময় লেগে যায়। দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিবিএস জানায়, সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সতর্ক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনকি ইরান সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাও তার অবস্থান সম্পর্কে জানেন না এবং সরাসরি যোগাযোগের কোনো উপায়ও তাদের নেই।

আলোচনা ব্যর্থ হলে ‘অন্য পথ’ খুঁজবে যুক্তরাষ্ট্র : ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একটি শক্তিশালী চুক্তি নিশ্চিত করবে অথবা ‘অন্য কোনো উপায়ে’ দেশটির মুখোমুখি হবে। সোমবার নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওই মন্তব্য করেছেন।যুদ্ধ অবসানের চুক্তি খুব কাছাকাছি এবং চুক্তির জন্য ওয়াশিংটন কোনও তাড়াহুড়ো করবে না বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুর নরমের পর রুবিও ওই মন্তব্য করলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে নয়াদিল্লিতে রুবিও বলেন, আমরা ভেবেছিলাম গতকাল রাতে অথবা সম্ভবত আজ কোনো খবর পেতে পারি। তবে এটি নিয়ে এখনই খুব বেশি ভাবার কিছু নেই।

ভারতের রাজধানীতে সরকারি সফরে থাকা রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার এবং উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে তাদের সক্ষমতা নিয়ে আমার মনে হয় আমাদের টেবিলে বেশ জোরালো একটি প্রস্তাব রয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য চাপ দিলেও গত ৮ এপ্রিল থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধবিরতি পালন করছে। তবে ইরান এখনও বেশির ভাগ জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ এবং ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘চুক্তিতে পৌঁছানো, সেটি প্রত্যয়িত এবং স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত’ মার্কিন অবরোধ ‘পুরোপুরি বহাল থাকবে’।

হরমুজ পেরিয়ে চীন ও পাকিস্তানের পথে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিবাহী ট্যাংকার : পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহী দুটি বিশাল ট্যাংকার। কাতার থেকে এলএনজি বোঝাই করে ট্যাংকার দুটি এখন পাকিস্তান ও চীনের দিকে এগিয়ে চলেছে। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ট্র্যাকিং ডেটার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে। এলএসইজি এবং ক্লেপারের শিপিং তথ্য অনুযায়ী, এলএনজি ট্যাংকার ফুওয়াইরিত আজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে। আগামীকাল মঙ্গলবার সেটির পাকিস্তানে পণ্য খালাস করার কথা রয়েছে। বাহামার পতাকাবাহী এই জাহাজ গত ২৮ মার্চ কাতারের রাস লাফান বন্দরে এলএনজি লোড করেছিল। এ ছাড়া কাতারএনার্জির এলএনজি ট্যাংকার আল–রাইয়ানও হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বেরিয়ে গেছে। কাতারের রাস লাফান বন্দরে লোড করা এই কার্গো জাহাজকে সর্বশেষ ২২ মে পারস্য উপসাগরে দেখা গিয়েছিল। সেটি এখন হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থান করছে। শিপিং তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৭ জুন চীনে সেটির পণ্য খালাস করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার ইগল ভেরোনা গত শনিবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বেরিয়ে গেছে। শিপিং তথ্য অনুযায়ী, এটি ১২ জুন পূর্ব চীনের নিংবো বন্দরে পৌঁছে পণ্য খালাস করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী এই জাহাজকে এশিয়ার বৃহত্তম রিফাইনার সিনোপেকের বাণিজ্য শাখা ইউনিপেক ভাড়া করেছে। শিপিং তথ্য অনুযায়ী, সেটি গত ২৬ ফেব্রুয়ারির দিকে বসরাহ ক্রুডের প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল লোড করেছিল। এর আগে দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল, মালয়েশিয়া যে সাতটি জাহাজের জন্য ইরানের কাছ থেকে প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি চেয়েছিল, ইগল ভেরোনা সেগুলোর একটি। ওই সাতটির মধ্যে পাঁচটি জাহাজ এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বেরিয়ে গেছে। বাকি দুটি এখনো উপসাগরে অবস্থান করছে।