
এবারের বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ, স্বয়ংক্রিয় কর রিফান্ড ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবায় কর সুবিধা তুলে ধরতে যাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাজেটে একদিকে যেমন কিছু খাতে কর ছাড় ও বিনিয়োগ প্রণোদনা দেওয়া হতে পারে, অপরদিকে রাজস্ব বাড়াতে তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এই বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, করদাতা, স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হতে যাচ্ছে- বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ বা ‘অর্থনৈতিক সাধারণ ক্ষমা।’
প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশে থাকা অর্থ দেশে এনে উৎপাদনশীল শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিনিয়োগ করা হলে ওই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না। তবে এই অর্থের ওপর স্বাভাবিক করহারের চেয়ে কিছুটা বেশি কর আরোপ করা হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে এই উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এতে সৎ করদাতারা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন এবং ভবিষ্যতে অর্থ পাচারে উৎসাহ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকার যদি প্রকৃতপক্ষে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিশেষ সুযোগ বা প্রণোদনার ব্যবস্থা রয়েছে। যেহেতু প্রচলিত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ, তাই বিকল্প উপায় হিসেবে সরকার এ ধরনের উদ্যোগ বিবেচনা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কঠোর ও স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে, প্রচলিত করহারের তুলনায় অতিরিক্ত কর আরোপ করে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে এ ধরনের অর্থ দেশে আনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।’
একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচারকারীরা যাতে এই সুবিধার অপব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি যারা দুর্নীতি বা অন্য কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, নতুন বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা সরকারের নেই। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন স্কেলে বেতন বৃদ্ধির অর্ধেক আগামী অর্থবছরে এবং বাকি অংশ ২০২৭-২৮ অর্থবছরে কার্যকর করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সংশোধিত ভাতা কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী বাজেটে চিনিযুক্ত পানীয় ও খাদ্যপণ্যের ওপর আরোপিত ন্যূনতম টার্নওভার কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব বিবেচনা করছে এনবিআর। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানের মুনাফা হোক বা লোকসান- বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হয়। একে ন্যূনতম টার্নওভার কর বলা হয়। ফলে কম মুনাফার কোম্পানিগুলোর ওপর করের প্রকৃত চাপ অনেক বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, এ খাতে করের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। পানীয় শিল্পের উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্পোরেট করসহ ন্যূনতম করের কারণে তাদের কার্যকর করহার ৪৩ থেকে ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। কোকাণ্ডকোলা সিসিআই বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ খান বলেন, উচ্চ করহার ব্যবসার সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের কার্বনেটেড কোমল পানীয় বাজারের আকার ছিল প্রায় ৬ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে তা কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২০১ কোটি টাকায়। তবে কর কমানোর এ উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রুমানা হকের মতে, দেশে ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। তাই চিনিযুক্ত পণ্যের ওপর কর কমানোর পরিবর্তে নতুন নতুন চিনিযুক্ত পণ্যকে করের আওতায় আনা এবং সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো উচিত। তার মতে, সরকারকে শুধু রাজস্ব নয়, জনস্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে বেশিরভাগ করদাতার জন্য স্বয়ংক্রিয় কর রিফান্ড ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। নতুন ব্যবস্থায় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পর কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত কর পরিশোধ করে থাকলে আলাদা আবেদন ছাড়াই তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সেই অর্থ সরাসরি তার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।
এনবিআর সূত্র বলছে, বর্তমানে বছরে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা আয়কর আদায় হয়। বিপরীতে প্রতি বছর ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার মতো কর ফেরত দিতে হয়। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় রিফান্ড পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়। স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ব্যবস্থা চালু হলে করদাতাদের আস্থা বাড়বে এবং কর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে আগামী বাজেটে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর ছাড় দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে— হার্টের রিং বা করোনারি স্টেন্টের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার, ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক কমানো, এপিআই (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস) খাতে বিনিয়োগে কর প্রণোদনা।
বর্তমানে একটি করোনারি স্টেন্টের দাম ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে একটি স্টেন্টের দাম সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। বিআইডিএসের গবেষণা অনুযায়ী, নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা একজন রোগীর মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার টাকার বেশি। ফলে বেশিরভাগ পরিবারকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। এ প্রেক্ষাপটে ডায়ালাইসিস সরঞ্জামের ওপর কর ছাড়কে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একদিকে স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড় দেওয়া হলেও অপরদিকে তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। লক্ষ্য হলো, আগামী অর্থবছরে এসব খাত থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়। বর্তমানে সিগারেটের খুচরা মূল্যের প্রায় ৮৩ শতাংশই বিভিন্ন ধরনের কর। আগামী বাজেটে প্রিমিয়াম, উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন- সব স্তরের সিগারেটের দাম বাড়তে পারে। অন্যদিকে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মদের ওপর প্রতি লিটারে ৪০০ টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
আগামী বাজেটের অন্যতম বড় ঘোষণা হতে পারে ‘লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।’ এই ব্যবস্থায় একজন নাগরিক গর্ভাবস্থা থেকেই রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আসবেন। এরপর শিশুকাল, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, বেকারত্ব এবং বার্ধক্য— প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা পাওয়া যাবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩২ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সব নাগরিককে এই কাঠামোর আওতায় আনা হবে। এ লক্ষ্যে আগামী অর্থবছর থেকেই ‘ওয়ান পারসন, ওয়ান অ্যাকাউন্ট’ ভিত্তিক ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দও ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, মাতৃত্ব ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।