রণক্ষেত্র মতিঝিল ব্যাংকপাড়া
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গে জলকামান ও টিয়ারশেল ব্যবহার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিক্ষোভকারীরা ‘কনশাস কাস্টমারস ফোরাম’ ব্যানারে ব্যাংকের সামনে জড়ো হন। তারা মানববন্ধন করে নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবি জানান এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে, এতে কয়েকজন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থলে কিছু সময় ধরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান চলতে থাকে, ফলে এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেও পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এবং বারবার অনুরোধের পরও তারা স্থান না ছাড়ায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র উপ-কমিশনার (মিডিয়া) এনএম নাসিরউদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা ব্যাংকের অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। পুলিশ তাদের এলাকা ছাড়ার জন্য বারবার অনুরোধ করে। তারা না সরায় জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে ছত্রভঙ্গ করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক।’ এদিকে গত ২৪ মে রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। আগের চেয়ারম্যান পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ঈদ ছুটির ঠিক আগের দিন ঘটে।
খুরশীদ আলম ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন, যাকে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করতে হয়। ওই সময় একাধিক কর্মকর্তা বিক্ষোভের মুখে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, আগের সরকারের সময় তার ভূমিকা বিতর্কিত ছিল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর একাধিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ও ঋণ অনিয়মের ব্যাপারে।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে সরানোর সম্ভাবনা নেই : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে তার পদ থেকে সরানোর কোনও সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলমান আন্দোলন বা বিক্ষোভ কর্মসূচির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না বলেও স্পষ্ট করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গতকাল সোমবার এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আন্দোলনের সঙ্গে চেয়ারম্যান নিয়োগের কোনও সম্পর্ক নেই।’ তিনি বলেন, “আজ যদি বাংলাদেশ ব্যাংক কোনও আন্দোলনের কারণে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পরবর্তীকালে যদি সেই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে আরেকটি পক্ষ আন্দোলন করে, তখন কী হবে? বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব নীতিমালা ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী চলবে। আন্দোলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনও সম্ভাবনা নেই।’ এর আগে গতকাল সোমবার সকাল থেকে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে একদল গ্রাহক ও সমর্থক নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। এতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন। তবে আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ২৪ মে রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। একই দিন ব্যাংকের কিছু গ্রাহক ও কর্মকর্তা পরিচয়ে একদল ব্যক্তির আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এম জুবাইদুর রহমান পদত্যাগ করেন। এছাড়া ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বর্তমানে দীর্ঘ ছুটিতে রয়েছেন। এদিকে আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। কিন্তু কোনও ধরনের উসকানি ছাড়াই তাদের ওপর পুলিশ বলপ্রয়োগ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘গ্রাহকদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের ঘটনা দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়।’ একইসঙ্গে আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত দাবির প্রতি তিনি সমর্থন জানান।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক ও আর্থিক অঙ্গনে আলোচনা চললেও বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে এবং এ বিষয়ে কোনও পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই।
ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ওপর পুলিশের গুলি, জামায়াতের নিন্দা : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর পুলিশের গুলি চালানো, লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস এবং জলকামান ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। একইসঙ্গে তিনি আন্দোলনরত গ্রাহকদের দাবির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।
বিবৃতিতে গোলাম পরওয়ার বলেন, সকালে ঢাকার মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে সাধারণ গ্রাহকরা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। ব্যাংকের আমানতকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার দাবিতে তারা কর্মসূচিতে অংশ নেন। তার দাবি, কোনও ধরনের উসকানি ছাড়াই পুলিশ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে গুলি চালানো হলে বহু আমানতকারী আহত হন। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বলপ্রয়োগ ও দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অনভিপ্রেত। তিনি এ ঘটনাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে মন্তব্য করেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, ‘গ্রাহকদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর ও যৌক্তিক। বিগত দিনে একটি নির্দিষ্ট মহলের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ব্যাংকিং খাতে যে নজিরবিহীন লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, দেশের মানুষ তা ভুলে যায়নি। গ্রাহকরা মনে করেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর। তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখলে ব্যাংকটি আবারও ভয়াবহ লুটপাটের মুখে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের আমানত অনিরাপদ হয়ে পড়বে। নিজের কষ্টের জমানো টাকার নিরাপত্তা চাওয়া এবং ব্যাংকের সুরক্ষায় সোচ্চার হওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।’ গোলাম পরওয়ার বলেন, ব্যাংক পরিচালিত হয় জনগণের আমানতের ওপর ভিত্তি করে। তাই গ্রাহকদের উদ্বেগ ও দাবিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর হামলার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একইসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক নিরসন এবং আমানতকারী ও গ্রাহকদের উদ্বেগ দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।
