সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ
হ্যাটট্রিক শিরোপা থেকে এক ম্যাচ দূরে বাংলাদেশ
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

২০২২ এবং ২০২৪ টানা দুই আসরে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে বাংলাদেশ। এবার লাল সবুজের মেয়েদের সামনে হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের মিশন। এই লক্ষ্য থেকে মাত্র এক ম্যাচ পিটার বাটলারের শিষ্যরা। রুদ্ধশ্বাস এক লড়াইয়ে নেপালকে হারিয়ে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে মারিয়াদের জয় ২-১ গোলের ব্যবধানে। হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচের যোগ করা সময়ে দারুণ নৈপুণ্যে এগিয়ে শামসুন্নাহার জুনিয়র বল বাড়ালেন গোলমুখে। নিখুঁত টোকায় বাকি কাজটুকু সেরে বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠলেন সাগরিকা। তার সঙ্গে বুনো উল্লাসে যোগ দিলেন বাকিরা।
এবার সেমিফাইনালে জয় পাওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ, আগের দিন মা হারান দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় শিউলি আজিম। তবে এই শোক বুকে চাপা দিয়েই মাঠে নামেন মেয়েরা। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে তিন পরিবর্তন এনে একাদশ সাজান বাংলাদেশ কোচ পিটার জেমস বাটলার। ভারত ম্যাচে খেলা মনিকা চাকমা, শামসুন্নাহার জুনিয়র ও সুরমা জান্নাতের বদলে খেলান আফঈদা খন্দকার, উমহেলা মারমা ও সুরভি আকন্দ প্রীতি। আগের দিন মা হারানো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শিউলি আজমিকেও রাখেন বেঞ্চে। শুরু থেকেই অগোছালো ফুটবল খেলতে থাকে বাংলাদেশ। মারিয়ার পাসগুলো হচ্ছিল না নিখুঁত। রক্ষণও ছিল না জমাট। গতবারের রানার্সআপ নেপাল তাই আধিপত্য করতে থাকে। ২২তম মিনিটে এগিয়েও যায় তারা।
কর্নারের পর মিলি আক্তার দুর্বল ফিস্টে ক্লিয়ার করতে পারেননি পুরোপুরি। বক্সে জটলার ভেতরে বল পেয়ে গীতা রানী চিপ শটে লক্ষ্যভেদ করেন। পরের মিনিটেই পাল্টা আক্রমণে নেপালের রক্ষণে ভীতি ছড়ায় বাংলাদেশ, কিন্তু প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের পরীক্ষা নিতে পারেনি তারা। ৩৪তম মিনিটে রাসি কুমারি ঘিসিংয়ের হেড আটকে ব্যবধান দ্বিগুণ হতে দেননি মিলি আক্তার। একটু পর প্রীতি রায়ের শটে লাফিয়ে কোনোমতে বলে হাত ছোঁয়ান মিলি, তার গ্লাভস ছুঁয়ে বল ক্রসবারে লাগে। কখনও এলোমেলো, কখনও তাড়াহুড়ো করে পাস বাড়ানোয় ম্যাচের লাগাম মুঠোয় নিতে পারছিল না বাংলাদেশ। রাইট ব্যাক কোহাতি কিসকু প্রায়ই তালগোল পাকিয়ে নেপালের জন্য খুলে দিচ্ছিলেন আক্রমণের দুয়ার।
খেলায় ধার ফেরাতে বাটলার দুটি পরিবর্তন আনেন ৩৮তম মিনিটে। তরুণ উমহেলা ও প্রীতিকে তুলে দুটি নারী সাফ জয়ী শামসুন্নাহার জুনিয়র ও তহুরা খাতুনকে নামান কোচ। এরপর বাংলাদেশের খেলায় গতি ফিরে। ৪৫তম মিনিটে ওই দৃষ্টিনন্দন গোলে দলে স্বস্তি ফেরান সবশেষ ফাইনালে জয়সূচক গোল করা ঋতুপর্ণা। ডান দিক থেকে এই ফরোয়ার্ডের কর্নারে বল বাতাসে ভেসে লাফিয়ে ওঠা গোলকিপার আঞ্জিলা সুব্বাকে ফাঁকি দিয়ে সরাসরি দূরের পোস্ট লেগে জালে জড়ায়। মোমিতা খাতুনের জায়গায় মনিকাকে নামিয়ে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করে বাংলাদেশ। শুরুতেই পোস্টের বাধায় বেঁচে যায় দল। রেখা পাডৌলের শট পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসা মিলিকে ফাঁকি দিলেও পোস্টে লেগে ফিরে। একটু পর রাশমি কুমারির শট যায় ক্রসবারের উপর দিয়ে।
৫৪তম মিনিটে একটু নিঃস্বার্থ হতেই পারতেন শামসুন্নাহার জুনিয়র। ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে তিনি যখন বাইরে শট নেন, তখন দূরের পোস্টে ফাঁকায় দাঁড়িয়ে গত সাফে দলের হয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ গোল করা তহুরা। একটু পর ছোট বক্সের একটু ওপর থেকে মনিকার হেড যায় ক্রসবারের অনেক উপর দিয়ে। ৬৮তম মিনিটে সারু লিম্বুর শট লাফিয়ে ওঠা মিলিকে পেরিয়ে উপরের জাল কাঁপায়। একটু পর আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীকে তুলে সাগরিকাকে নামান বাংলাদেশ কোচ।
নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট বাকি থাকতে আফিদা ইশারায় পানি চাইলেন। তাতে খেলা বন্ধ করতে বাধ্য হলেন রেফাারি। এই সুযোগে পানি পান করে নিলেন দুই দলের আরও অনেকে। এরপরই আক্রমণে ওঠা নেপালের আক্রমণ কর্নারের বিনিময়ে ক্লিয়ার করেন কোহাতি। ছয় মিনিটের যোগ করা সময়ের শুরুতে বাম দিক থেকে সতীর্থের বাড়ানো বল ধরে শামসুন্নাহার জুনিয়র বক্সে ঢুকে পড়েন দারুণ ক্ষিপ্রতায়। ঠান্ডা মাথায় তিনি বল বাড়ান গোলমুখে। জটলার মধ্যে কোনোমতে জালে বল জড়ান সাগরিকা। প্রথমবারের মতো এগিয়ে যাওয়ার উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে বাংলাদেশ।
একটু পরই মাঠে শুয়ে পড়েন কোহাতি। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়েন এই ডিফেন্ডার। খেলা শুরু হলে নেপালের নিশা থোকারের শট গ্লাভসে জমান মিলি। একটু পর শেষের বাঁশি বাজলে ফাইনালে ওঠার আনন্দে মেতে ওঠে মেয়েরা। চতুর্থবারের মতো ফাইনালে উঠল বাংলাদেশ। ছয়বার ফাইনাল খেলেও শিরোপা স্বাদ না পাওয়া নেপালের অপেক্ষা বাড়ল আরও।
পরিসংখ্যানের পাতায় দুই দলের মুখোমুখিতে নেপালের সমান ৬টি জয় পেল বাংলাদেশ। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৪ ম্যাচে দুই দলের বাকি ২টি ম্যাচ ড্র।
