নিম্ন আয়ের মানুষের বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে না
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

খুচরায় বিদ্যুতের দাম বাড়লেও নিম্ন আয়ের মানুষ আগের দামেই বিদ্যুৎ পাবেন। নতুন দাম নির্ধারণের এক দিনের মাথায় আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ফলে ০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী লাইফলাইন বা প্রান্তিক গ্রাহক এবং ০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম আগের হারেই থাকছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা বহাল থাকবে। জুন মাসের বিল থেকে এ হার কার্যকর হবে। এর আগে গত বুধবার বিইআরসি খুচরা বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছিল। সেখানে প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়। সে হিসাবে প্রান্তিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৬৯ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৯২ পয়সা বেশি গুনতে হতো।
বিইআরসি বলেছে, গত বুধবার জারি করা আদেশে নির্ধারিত এ দুই শ্রেণির মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য ৪ জুন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো আবেদন করে। পরে শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ (খুচরা) ট্যারিফ প্রবিধানমালার বিধান অনুযায়ী বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না করে আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিইআরসির ঘোষিত বিদ্যুতের নতুন দাম প্রান্তিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির প্রস্তাবিত দাম প্রতিফলিত হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, এর ফলে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়ে যাবে এবং তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য নির্ধারণ করা বিদ্যুতের দাম পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে কমিশনকে চিঠি পাঠানোর কথা বলেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন সিদ্ধান্ত জানাল বিইআরসি।
সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে কমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহারের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর আয় কমবে। সেই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করতে হবে।
বিইআরসি নতুন দর নির্ধারণ করেছিল, সেখানে খুচরা বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্যহার ছিল ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। নতুন সিদ্ধান্তে তা ২৩ পয়সা কমে ১০ টাকা ৪০ পয়সায় নেমে আসবে। তবে গত বুধবার জারি করা খুচরা বিদ্যুতের নতুন দাম সংক্রান্ত আদেশের অন্য সব অংশ অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। ফলে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ঘোষিত নতুন মূল্যহার বহাল থাকছে। শিল্প, বাণিজ্যিক, সেচ ও অন্যান্য গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রেও নতুন দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করে বিইআরসি। পরে বুধবার বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
সেখানে আবাসিক গ্রাহকদের সব স্তরেই দাম বাড়ানো হয়েছিল। প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, কারণ এই দুই শ্রেণিতে মূলত নিম্ন আয়ের গ্রাহকেরাই অন্তর্ভুক্ত।
গণশুনানিতে পিডিবি প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য তুলনামূলক কম হারে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিলেও কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তার চেয়ে বেশি মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তই একদিনের মধ্যে সংশোধন করল বিইআরসি।
বিদ্যুতের দাম কমাতে রিভিউ আবেদন : দাম বৃদ্ধির ঘোষণার একদিন পরই লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য পুরোনো দাম বহালের আবেদন করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে এ-সংক্রান্ত রিভিউ আবেদন জমা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আবেদনটি দ্রুত পর্যালোচনা করা হবে।
তিনি জানান, যেহেতু প্রস্তাবটি গ্রাহকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং এতে বিদ্যুতের দাম কমানোর বিষয় রয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে গণশুনানির প্রয়োজন হবে না। কমিশন দ্রুত সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। এর আগে গত বুধবার বিইআরসি নতুন বিদ্যুতের মূল্যহার ঘোষণা করে। নতুন ঘোষণায় আবাসিক লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রথম ধাপে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়।
ঘোষিত মূল্যহার অনুযায়ী, নতুন দাম ১ জুন থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে পিডিবির রিভিউ আবেদনের ফলে লাইফলাইন ও নিম্ন ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য মূল্যহার পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দেশে বর্তমানে লাইফ লাইন গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০ জন। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতায় রয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১টি সংযোগ, যা মোট লাইফ লাইন গ্রাহকের বড় অংশ। এর বাইরে পিডিবির আওতায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, নেসকোর ৪ শতাংশ এবং ওজোপাডিকোর প্রায় ৩ শতাংশ গ্রাহক রয়েছেন। ঢাকায় বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসির আওতায় রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ এবং ডেসকোর আওতায় প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ লাইফলাইন গ্রাহক।
অর্থাৎ সুবিধাভোগীদের বড় অংশই গ্রামীণ এলাকার নিম্ন আয়ের পরিবার। এ কারণে মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে এসব পরিবার।
