আরও ৯ পুশইন রুখে দিল বিজিবি
* মেহেরপুর সীমান্তে ঠেলে দেওয়া ৬ জনের প্রবেশ ঠেকাল বিজিবি-গ্রামবাসী * নওগাঁয় ১৯ ঘণ্টা পর শূন্য রেখায় থাকা ১৭ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ * চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে শূন্যরেখায় নেই ২৮ জন, বিজিবি বলছে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ * শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে ১০ নারী-পুরুষ-শিশু, দুই দফা পতাকা বৈঠকেও সমাধান আসেনি
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ‘পুশইনের ৯টি চেষ্টা’ ঠেকানোর দাবি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার সকালে বিজিবির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
যেসব এলাকায় পুশইনের চেষ্টা রুখে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিজিবি, তার মধ্যে রয়েছে- ঝিনাইদহের মহেশপুর ব্যাটালিয়নের আওতাধীন যাদবপুর সীমান্তে ৩ জনের প্রবেশের চেষ্টার সময় বিজিবি টহলদল সীমান্তের শূন্যরেখোয় অবস্থান নিয়ে তাদের বাধা দেয়। এরপর ওই ব্যক্তিরা ভারতে ফিরে যায়। নওগাঁর করমুডাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা ঠেকিয়েছে বিজিবির টহলদল। তিস্তা ব্যাটালিয়নের আওতাধীন বড়খাতা সীমান্তে ১১ জনের অনুপ্রবেশ ঠেকিয়েছে বিজিবি। পয়ষট্টিবাড়ী সীমান্তে আরও ১০ জনের পুশইন ঠেকানো হয়েছে। লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের আওতাধীন দিঘলটারী সীমান্ত এলাকায় ৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা হলে বিজিবি তা রুখে দিয়েছে। দুর্গাপুর সীমান্তে ৪ জনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়েছে। ওই ব্যক্তিরা ভারতীয় ভূখণ্ডের কাঁটাতারবিহীন চর এলাকায় অবস্থান করছে। নীলফামারী ব্যাটালিয়নের আওতাধীন পঞ্চগড়ের বড়বাড়ী প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকায় ১০ জনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়েছে। এ বিষয়ে বিজিবি-বিএসএফ কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়েছে।
নেত্রকোণা ব্যাটালিয়নের আওতাধীন কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ১৬-১৭ জন ব্যক্তিকে ‘পুশইনের জন্য জড়ো করা হয়’ বলে জানিয়েছে বিজিবি। তাদের কঠোর অবস্থানের কারণে ওই ব্যক্তিদের লেংগুড়া সীমান্তের বিপরীতে বিএসএফের চিকনী ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিজিবি বলেছিল তারা ১০টি পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। বাহিনীর ভাষ্য, সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে তারা নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
মে মাসের শুরুতে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরপরই ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কাউকে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহ হলেই সরাসরি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ ফেরত পাঠানোর আগে রাখার জন্য রাজ্যের প্রতিটি জেলায় ‘আটক শিবির’ গড়ে তোলা হয়। রাজ্য সরকারের ওই সিদ্ধান্তে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় রাজ্য ছাড়তে বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তগুলোতে জড়ো হচ্ছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সম্প্রতি বলেছেন, ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া প্রতিহত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তা অব্যাহত রাখা হবে।
মেহেরপুর সীমান্তে ঠেলে দেওয়া ৬ জনের প্রবেশ ঠেকালো বিজিবি- গ্রামবাসী : মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে ভারত থেকে ঠেলে দেওয়া ছয়জনকে প্রতিহত করেছে বিজিবি। বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) এই পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ওই ছয়জন বর্তমানে কাঁটাতারের বেড়ার পাশে অবস্থান করছেন। এ ঘটনায় গত শনিবার ভোর থেকে সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তের মেইল পিলার ১০৪-এর সাব পিলার ৫-এর কাছ থেকে গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া গ্রামের হাটপাড়া দিয়ে ছয়জনকে পুশইন করার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে তারা ভারতের সীমান্তে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। বিএসএফ তাদের গ্রহণ না করায় তারা কাঁটাতারের বেড়ার পাশে ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, দুইজন নারী এবং এক শিশু রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া খুলে ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়। তারা ছয়জন পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেন। প্রতিরোধের মুখে তারা কাঁটাতারের বেড়ার পাশে ফিরে যান। কিন্তু বিএসএফ কাঁটাতারের ওপারে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এপারে বিজিবি ও গ্রামবাসীর অবস্থান। এদিকে, বিজিবি হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিয়ে পুশইন প্রতিরোধ করছে। তাদের কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানাচ্ছে।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা বলেন, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং পুশইন করতে দেওয়া হবে না। বিএসএফকে পতাকা বৈঠকের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পতাকা বৈঠকের পরেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
নওগাঁয় ১৯ ঘণ্টা পর শূন্য রেখায় থাকা ১৭ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ : নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত এলাকার শূন্য রেখায় থাকা নারী-পুরুষ এবং শিশুসহ সেই ১৭ জনকে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা।
বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টার প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর শুক্রবার রাত ১টার দিকে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান নওগাঁ ব্যাটালিয়ান ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম। গতকাল শনিবার সকালে বিজিবির মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কলমুডাঙ্গা গ্রামের মাহবুব আলম বলেন, ‘ওই ১৭ জনকে বিজিবি সদস্যরা পাহারা দিয়ে রেখেছিল। রাত ১১টার দিকে আমার ট্রাক্টরে ধান লোড দিচ্ছিলাম তখনও বিজিবি সদস্যরা সেখানে ছিল। এরপর বিএসএফ সদস্যরা তাদের টেনে হিঁচড়ে ভারতে নিয়ে যায়।
তবে ওই ব্যক্তিরা বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে যেতে চাচ্ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিএসএফ নিয়ে যাওয়ার সময় তারা অনেক কান্নাকাটি করছিল। তাদের কান্নার শব্দ শুনে আমরা সামনে এগিয়ে গিয়েছিলাম। তখন বিএসএফ আমাদের বাধা দিয়ে তাদের নিয়ে চলে যায়।’
এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা চালায় ৮৮ বিএসএফ পান্নাছাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা। তাদের মধ্যে ছিল ৬ জন পুরুষ ৬ জন নারী এবং পাঁচজন শিশু।
সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে কড়া অবস্থান নেয় বিজিবি সদস্যরা। তবে দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টা যাবত পুশইনের এই চেষ্টা অব্যাহত রাখে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী। কিন্তু স্থানীয়দের সহযোগিতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় বিজিবি সদস্যরা। বিজিবি সদস্যদের এমন অবস্থানের প্রশংসা করেছেন স্থানীয়রা।
বিজিবির নওগাঁ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, খবর পাওয়ার পর ওই স্থানে বিজিবির টহল বৃদ্ধি করা হয়। মানবিকদিক বিবেচনা করে শুরুতে শূন্য লাইতে থাকতে দিলেও সন্ধ্যার পরে তাদের নোম্যান্সল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
‘রাত একটার দিকে বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেন। এরপর রাতের আঁধারে তারা পুশইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ভারতে ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে ধারণা করা যাচ্ছে। সীমান্তের ওই এলাকাতে বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে শূন্যরেখায় নেই ২৮ জন, বিজিবি বলছে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ : চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা ২৮ জনকে আজ শনিবার সকাল থেকে শূন্যরেখায় আর দেখা যাচ্ছে না। বিজিবির প্রতিরোধের মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে গত দুইদিন শূন্যরেখায় অবস্থান করছিলেন। বিজিবির ধারণা, শুক্রবার রাতের আঁধারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়েছে। ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছেন।
মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ওই ২৮ জন ভারতের ভেতরে শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে অবস্থান করছিলেন। বর্তমানে সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে তাঁদের অবস্থান বা চলাচল আর পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, শুক্রবার গভীর রাতের কোনো এক সময়ে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। এর আগে ৪ জুন ভোররাত তিনটার দিকে বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ২৮ জন বাংলাদেশিকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির সতর্ক অবস্থান ও তাৎক্ষণিক তৎপরতার কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে ওই ব্যক্তিরা শূন্যরেখার ভারতীয় অংশে দুই দিন ধরে ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অবস্থান করছিলেন। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।
শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে ১০ নারী-পুরুষ-শিশু, দুই দফা পতাকা বৈঠকেও সমাধান আসেনি: শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে ১০ নারী-পুরুষ-শিশু, দুই দফা পতাকা বৈঠকেও সমাধান আসেনি পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) যে ১০ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা করেছে, তারা এখনও শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। গতকাল শুক্রবার ভোর পাঁচটা থেকে আজ শনিবার বেলা তিনটা পর্যন্ত কোনো দেশই তাদের সীমান্তে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তারা খোলা আকাশের নিচে ফসলি জমির আলে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এ সময় দুইপাশে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও বিএসএফ সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
শূন্যরেখায় অবস্থান করা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুজন নারী ও তিনজন শিশু। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে বজ্রবৃষ্টির সময়ও তারা সেখানে ছিলেন। শূন্যরেখায় ফসলি জমির যে আলটিতে তারা বসে আছেন, সেখানেও পানি জমেছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী দুই দফা পতাকা বৈঠকে বসলেও কোনো সমাধান আসেনি।
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে বাংলাদেশের নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যটালিয়ন এবং ভারতের ৯৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মধ্যে কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় আধা ঘণ্টার ওই পতাকা বৈঠকেও কোনো সুরাহা হয়নি। এর আগে গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিজিবির বড়বাড়ি বিওপি এবং বিএসএফের সাকাতি ক্যাম্পের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
দুপুরের সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি গিয়ে দেখা যায়, পানি জমে থাকা ফসলি জমির আলে পুশইন- চেষ্টার শিকার নারী, শিশুসহ ১০ জনের কেউ দাঁড়িয়ে আবার কেউ কেউ বসে আছেন। এ সময় তাদের মধ্যে থাকা আবদুস সালাম নামের এক যুবক উত্তেজিত হয়ে বলছিলেন, ‘আমরা কী চোর না ডাকাত যে আমাদের এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন। ভারতে গিয়ে যদি আমরা অপরাধ করে থাকি, তাহলে আমাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হোক। কিন্তু এভাবে না খাইয়ে পানির মধ্যে কেন কষ্ট করে রাখা হবে। আমরা কি মানুষ না?’
এর আগে শুক্রবার ভোরে ওই সীমান্ত দিয়ে ওই ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে কঠোর নজরদারির কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি বলে জানিয়েছে বিজিবি। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা প্রধানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, মানুষগুলা রাতে বৃষ্টির সময় খুব কষ্ট করে সেখান ছিল। একজন বয়স্ক মানুষ আর বাচ্চাগুলো বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপছিল।
মো. হানিফ নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ওরাও তো মানুষ, ওদের কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে। ঝড়বৃষ্টির রাতে ফাঁকা জায়গাটাতে ওরা খুব কষ্টে ছিল। আমরা চাই, ওদের ভারত সরকার নিয়ে যাক, না হলে বাংলাদেশ সরকার কোনো একটা ব্যবস্থা করুক। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হলো না।’
নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভারতে ৯৩ বিএসএফ ব্যটালিয়ন কমান্ডারের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করেছি। সেখানে আমি তাদের ফেরত নিতে রিকুয়েস্ট করেছি। কিন্তু তারা (বিএসএফ) বলেছে যে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক, তাঁদের নিতে পারবে না। আমি বলেছি যে তারা ভারতের অভ্যন্তরে ছিলেন, ইন্টারন্যাশনাল ল’ (আইন) মেনে তাঁদের আইসিপি (ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট বা সমন্বিত চেকপোস্ট) দিয়ে ফেরত পাঠানো উচিত। কারণ, রাতের অন্ধকারে বর্ডার ক্রস করে ঠেলে দেওয়া অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। তারা খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। রাতের বেলা বৃষ্টির মধ্যে ছিলেন, বজ্রপাত ছিল। এভাবে তো মানুষকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া ঠিক নয়।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তারপর তারা (বিএসএফ) বলেছে যে তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবে, জানাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই ব্যক্তিদের ফেরত নিতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমরাও আমাদের পজিশন তাদের স্পষ্ট করেছি যে আমরা এভাবে কাউকে গ্রহণ করব না। তারা যদি বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে যথাযথ প্রসিডিউর অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল ল’ অনুযায়ী পাঠালে আমরা তাদের গ্রহণ করব। বাট, এভাবে কোনো প্রকার পুশইন আমরা একসেপ্ট করব না।’
বাংলাদেশে পুশইন নিয়ে প্রশ্নে জয়সোয়াল বললেন, অবৈধ বিদেশিদের বিতাড়ন হচ্ছে আইন অনুযায়ী : ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল। গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। ব্রিফিং চলাকালে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের এক সংবাদকর্মী বাংলাদেশ-সংক্রান্ত প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছে ঢাকা। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাইলে জয়সোয়াল বলেন, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ যেকোনো বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে এবং সেই আইন মেনেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য প্রথমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়, যাতে তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করা যায়। যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রত্যাবাসন বা বিতাড়নের কার্যক্রম শুরু করা হয়।
রণধীর জয়সোয়াল আরও বলেন, এ ধরনের বহু অনুরোধ এখনও বাংলাদেশি পক্ষের কাছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব বিষয় দ্রুত সমাধান হলে ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
