মার্কিন হামলার পর কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের হামলা
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
হরমুজ প্রণালীর দিকে ইরানের ছোড়া ড্রোন ভূপাতিত করার পর আজ শনিবার ইরানের উপকূলীয় রাডার ও নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টার মধ্যেই এ ঘটনা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালীর দিকে চারটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ড্রোনগুলোর লক্ষ্য ছিল ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, এর জবাবে ইরানের গোরুক ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। উভয় স্থানই হরমুজ প্রণালীর তীরে অবস্থিত।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এ অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা চারটি তেলবাহী ট্যাংকারেও গুলি চালানো হয়েছে। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অজ্ঞাত উৎস থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। একই সময়ে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়।
ইরান দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, সাতটি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ছয়টি ভূপাতিত করা হয়েছে এবং একটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।
তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরোক্ষ আলোচনায় যুক্ত রয়েছে। সম্ভাব্য এ চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হবে।
ইরানের কেশম দ্বীপ। তবে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় এখনও কোনো সমঝোতা হয়নি।
যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে তেহরান চায় জ্বালানি তেল বিক্রির বিপুল রাজস্বে প্রবেশাধিকার, অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড়, মার্কিন বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রভাব বজায় রাখা।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে ইরান কার্যত প্রণালীটির চলাচল সীমিত করে রেখেছে। এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করা হলেও দেশটির হাতে এখনও প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের এখনও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আছে। শতকরা হিসেবে বললে, তাদের প্রায় ২১ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট রয়েছে। এটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা, তবে আমরা প্রথমে হামলা চালানোর সময় যে পরিমাণ ছিল, এখন তত নয়।’
ইরানের নেতারা এখনও কেন সমঝোতায় আগ্রহী নন এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘কারণ তারা শক্তিশালী এবং গর্বিত। এমন কিছু সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হবে, যা তারা কখনও ভাবেনি। তাদের আর কোনো বিকল্প নেই, তবে এতে কিছুটা সময় লাগবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলও অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে।
এই সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। শুক্রবার জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের লাখো মানুষ ক্ষুধার আরও কাছাকাছি চলে যাচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি শুক্রবার সিএনএনকে বলেন, শান্তি চুক্তিনির্ভর করছে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করে কি না তার ওপর। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে তারা ‘একটি অন্ধকার করিডোরে প্রবেশ করবে’। এদিকে সমান্তরাল আরেক সংঘাতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ শুক্রবার জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর দুটি হামলা চালিয়েছে। এর একটি ছিল সম্প্রতি দখল করা বিউফোর্ট দুর্গের কাছাকাছি। লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলা হয়েছে।
ইরান আবারও হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং একইসঙ্গে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তেহরান বলেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত হলো ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি। মার্চের শুরুতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তাদের পদক্ষেপ ছিল তেহরানের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।
