সীমান্তে উত্তেজনা, ১১ জেলায় বিজিবির সঙ্গে আনসার মোতায়েন

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সহায়ক শক্তি হিসেবে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। গতকাল সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ২০২৫ সালে বিজিবি ও আনসার বাহিনীর মধ্যে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতা স্মারকের আওতায় সীমান্তবর্তী এলাকায় এ সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ও সার্বিক নিরাপত্তা চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। এরইমধ্যে দেশের সীমান্তবর্তী ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় উপজেলা ও থানাভিত্তিক আনসার, ভিডিপি ও টিডিপি সদস্যদের মোতায়েন সম্পন্ন হয়েছে। জেলাগুলো হলো—চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর ও খাগড়াছড়ি।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেকোনো জরুরি বা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং বর্ডারে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত জনবল সরবরাহ করার জন্য আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যদেরও সার্বক্ষণিক প্রস্তুত ও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, সীমান্ত নিরাপত্তা কার্যক্রমে আনসার ও ভিডিপির এই সম্পৃক্ততা দেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি চোরাচালান ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

পঞ্চগড় সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ৬৯ ঘণ্টা পর ১০ জনকে সরিয়ে নিল বিএসএফ : পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে ‘পুশ ইন’ চেষ্টার শিকার নারী, শিশুসহ ১০ জনকে ৬৯ ঘণ্টা পর শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত রোববার দিবাগত রাত ২টা ৪০ মিনিটে সীমান্তের নিরাপত্তা বাতি বন্ধ করে ওই ১০ জনকে নিজেদের ভূখণ্ডের দিকে সরিয়ে নেয় বিএসএফ। এর আগে গত শুক্রবার ভোরে ওই সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে তাঁরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। এর পর থেকে কখনো রোদ, আবার কখনো বজ্রবৃষ্টির মধ্যেই তাঁরা শূন্যরেখার একটি ফসলি জমির সরু আলে তাঁরা অবস্থান করছিলেন। গত শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে গত রোববার রাত ২টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত ৬৯ ঘণ্টার বেশি সময় কোনো দেশই তাঁদের নিজ নিজ সীমান্তে প্রবেশ করতে দেয়নি। ফলে বৃষ্টির পানি জমে থাকা সরু আলে চরম দুর্ভোগের মধ্যে অবস্থান করছিলেন তাঁরা। পুশ ইন চেষ্টার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুজন নারী ও তিনটি শিশু। এ ঘটনায় গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে বাংলাদেশের নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও ভারতের ৯৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে শুক্রবার বিজিবির বড়বাড়ি বিওপি ও বিএসএফের সাকাতি ক্যাম্পের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়েও পতাকা বৈঠক হয়। তবে দুই দফার বৈঠকেই কোনো সমাধান হয়নি। হাড়িভাসা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। ওই সময় বৃষ্টিতে ভিজে নারী-শিশুসহ ওই ১০ জন শূন্যরেখায় ছিলেন। পরে রাত আড়াইটার পর হালকা বৃষ্টির সময় বিএসএফ সদস্যরা এসে ওই ১০ জনকে তাদের দিকে (ভারতের দিকে) নিয়ে গেছে। তিন দিন ধরে রোদণ্ডবৃষ্টিতে ওখানে থাকা বাচ্চা আর নারীদের কষ্ট দেখে খুবই খারাপ লাগছিল। বাড়িতে খেতে বসলেই ওই বাচ্চাদের চেহারা চোখে ভাসে। ঠিকমতো খেতে পারছিলাম না। নিয়ে গেছে ভালোই হয়েছে। এতে সীমান্ত এলাকার মানুষও স্বস্তি পেয়েছে।’ গতকাল সোমবার সকালে নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল রাত ২টা ৪০ মিনিটে বিএসএফ তাদের সিকিউরিটি লাইট বন্ধ করে শূন্যরেখায় থাকা নারী, শিশুসহ ওই ১০ জনকে ফিরিয়ে নিয়েছে। সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবির কঠোর নজরদারি অব্যাহত আছে।

পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির নিরাপত্তা জোরদার : পুশইন ঠেকাতে কুড়িগ্রাম সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। গত রোববার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি) জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধ পুশইনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুড়িগ্রাম সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোড়দার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সীমান্তজুড়ে নজরদারি ও টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে।

বিজিবি জানায়, সীমান্তের প্রতিটি বিওপি (বর্ডার আউটপোস্ট) থেকে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি দিন-রাত বিশেষ কৌশলগত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ পুশইন প্রতিরোধে বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে যৌথ টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি পেশাদারিত্বের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিজিবি। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি) ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে গত শনিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে জামালপুর ব্যাটালিয়ন (৩৫ বিজিবি) অধীনের রৌমারী সীমান্তের ঝাউবাড়ী ও খেয়ারচর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তৎপরতার তথ্য পাওয়া যায়। মেইন পিলার ১০৬৮ থেকে ১০৭১ নম্বর পিলার পর্যন্ত ভারতের ১৮৩ বিএসএফ সদরটিলা ক্যাম্পের সদস্যরা কয়েকজন বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয় নাগরিককে সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় নিয়ে আসে বলে খবর পাওয়া যায়।

এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য পুশইন ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেন। বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষকে সীমান্ত এলাকায় নজরদারিতে অংশ নিতে দেখা গেছে।

রৌমারী খেয়ারচর বিজিবি ক্যাম্পের নায়েক সুবেদার বশির আহমেদ জানান, গত শনিবার ও রোববার রাত এবং সোমবার সকালেও বিএসএফ কয়েকজনকে খেয়ারচর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। তবে বিজিবি সদস্য ও স্থানীয় জনগণের প্রতিবাদের মুখে তারা ওই চেষ্টা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। কুড়িগ্রাম-২২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মোহাম্মদ মাহবুব-উল-হক বলেন, সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় কোনো সন্দেহজনক গতিবিধি পরিলক্ষিত হলে দ্রুত বিজিবিকে অবহিত করার অনুরোধ করা হয়েছে।

পুশইন ঠেকাতে ভারতকে ১২-১৩টি চিঠি দিয়েছে সরকার- পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) শক্তভাবে পুশইন প্রতিহত করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পুশইন বন্ধে ভারত সরকারকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।’ গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব তথ্য জানান প্রতিমন্ত্রী। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের পুশইনের চেষ্টা বিজিবি শক্তভাবে প্রতিহত করছে। নিয়ম না মেনে পুশইনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। পুশইন বন্ধে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে ভারতকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইলিগ্যাল (অবৈধ) যারা আছে তাদের ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আছে। সেটা মেনেই ভারতকে কাজ করতে হবে। পুশইন দুদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।’

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) শিশু, নারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানো ঠেকাতে সম্প্রতি বাংলাদেশের ২৬ জেলার সীমান্তে বিপুল সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা তারা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় লোকজনও তাদের সহযোগিতা করছেন। ভারত থেকে পুশইনের মধ্যে সোমবার থেকে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শুরু হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, সম্মেলনে অবৈধ পুশইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে।