যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই বৈঠক শেষ
কঠোর অবস্থানে বিজিবি
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ১২ জনকে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। গতকাল শুক্রবার ভোরে দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের চর বিলগাথুয়া এলাকার ১৪৮/৩ এস সীমান্ত পিলার দিয়ে বিএসএফ ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায়। পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় জনতা তাদের পুনরায় সীমান্তবর্তী মাথাভাঙ্গা নদী পার করে ভারতীয় সীমানায় ঠেলে দেয়। বিজিবি সূত্র জানায়, ওই ব্যক্তিদের মধ্যে চার জন পুরুষ, চার জন নারী ও চার জন শিশু রয়েছে। বর্তমানে ওই ১২ জন ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বাইরের অংশে অবস্থান করছেন।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত দিয়ে যে ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠান হয়েছে তারা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ কাজে স্থানীয় সীমান্তবাসীও সহযোগিতা করছেন।
প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল জানান, আজ ভোরের দিকে ভারত থেকে ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় জনগণ ও বিজিবি যৌথভাবে তাদের প্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করেছে।
প্রাগপুর কম্পানি কমান্ডার সুবেদার আসাদুজ্জান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ১২ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তারা বর্তমানে সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে ভারতের ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কুষ্টিয়া বিজিবির ৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ কামাল রনি পুশইনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ বিষয়ে ভারতীয় বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
ঝিনাইদহ সীমান্তে ৭ দিনে ৫ বার পুশ ইনের চেষ্টা প্রতিহত, বিজিবির সঙ্গে পাহারায় এলাকাবাসী : ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ঠেলে পাঠানো (পুশ ইন) ঠেকাতে বিশেষ টহল, হ্যান্ডমাইকে সতর্কবার্তা, ঝোপঝাড়ে অবস্থান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে তৎপরতা চালাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবির দাবি, গত সাত দিনে বিএসএফ পাঁচবার পুশ ইনের চেষ্টা চালালেও প্রতিবারই তা প্রতিহত করা হয়েছে। বিজিবি বলছে, অবৈধভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে লোকজন ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে সীমান্তে কঠোর নজরদারির কারণে এখন পর্যন্ত মহেশপুর সীমান্তে কোনো পুশ ইনের ঘটনা ঘটেনি।
বিজিবি সূত্র জানায়, ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন মহেশপুর উপজেলায় ১২টি বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) আছে। এর মধ্যে যাদবপুর, সামন্তা, মাটিলা, বাঘাডাঙ্গাসহ অন্তত পাঁচটি বিওপি পুশ ইনের ঝুঁকিতে আছে। এসব এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
মহেশপুরের সঙ্গে ভারতের ৭৮ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। এর মধ্যে ৬৮ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও যাদবপুর ও মাটিলা বিওপি-সংলগ্ন প্রায় ১০ কিলোমিটার সীমান্তে কোনো বেড়া নেই। ফলে ওই অংশকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে বিজিবি। সীমান্তের ওপারে আছে ভারতের নদীয়া জেলার বাঁশখালী থানা ও উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাগদা থানা।
সীমান্তবর্তী গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা হারুন অর রশীদ বলেন, ‘বিএসএফ তাদের কাঁটাতার ঘেঁষা সড়কে বড় গাড়িতে করে লোকজন ধরে এনে জমা করেছিল। আমরা দেখেছি। পরে রাতে কাঁটাতারের আলো বন্ধ করে গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে এলাকাবাসী ও বিজিবির শক্ত অবস্থানের কারণে তা ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, দিনের বেলাতেও পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়েছে, যা স্থানীয় লোকজন মিলে প্রতিহত করেছেন। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন যাদবপুর, সামন্তা, মাটিলা, বাঘাডাঙ্গা, কুসুমপুর ও শ্রীনাথপুর বিওপি এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার দেখা যায়। হাতে মাইক ও বাঁশি নিয়ে সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিশেষ করে নাটিমা ইউনিয়নের গোপালপুর এবং কাজিরবেড় ইউনিয়নের সামন্তা ও মাটিলা সীমান্তে বিজিবির উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে। এক দল সদস্য খাবারের বিরতিতে গেলে অন্য দল দায়িত্ব নেয়।
যাদবপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তে বিএসএফের পুশ ইন চেষ্টার আলামত দেখলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে তা বিজিবিকে জানাই। বিজিবির সঙ্গে রাত জেগে গ্রামের মানুষ সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। গ্রামের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে, কোনো খারাপ কিছু না ঘটে যায়।’
মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রফিকুল আলম বলেন, ‘৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীন সীমান্ত এলাকায় পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ সফল হয়নি। তারা পাঁচ দফা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পুশ ইনের চেষ্টা করেছিল। আমাদের সৈনিকেরা সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তারা বিরতিহীন সীমান্তে নজরদারি ও টহল বজায় রেখেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ, আনসার সদস্য ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরাও আমাদের সৈনিকদের সঙ্গে টহলে সহায়তা করছেন। তারা আমাদের নানাভাবে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে আমরা কোনো ছাড় দেব না।’
নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক : নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে চার দিনের বৈঠক শেষ হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। সেখানে সীমান্তের সাম্প্রতিক উত্তেজনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে শীর্ষবৈঠক শেষে কোনো যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন হয়নি। গত সোমবার বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি)’র প্রধান মেজর জেনারেল মহম্মদ আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল নয়াদিল্লিতে পৌঁছে বিএসএফের ডিজি প্রবীণ কুমার-সহ অন্যান্য কর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেন। মঙ্গলবার দিল্লির লোদী রোডে বিএসএফের সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ ৫৭তম সীমান্ত শীর্ষবৈঠক। কিন্তু নজিরবিহীন ভাবে শীর্ষবৈঠক শেষে যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষরের পর দুই বাহিনীর ডিজি প্রথা মেনে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। শুধু কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে সম্পর্কে একটি প্রেস বিবৃতি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।
চলতি বছরের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঢাকায় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত রোববার ঢাকায় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে বিএসএফের ‘পুশইন’ এবং সীমান্তে গুলি চালানোর ঘটনাগুলো তারা বৈঠকে উত্থাপন করবেন।
প্রসঙ্গত, দুই দেশের মধ্যে ডিজি-স্তরের সীমান্ত বৈঠক ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হতো। তবে ১৯৯৩ সালে এটিকে বছরে দু’বার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেখানে উভয়পক্ষ পর্যায়ক্রমে নয়াদিল্লি ও ঢাকায় বৈঠকে অংশ নেয়। বিএসএফ-বিজিবি সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায়। তখন বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় ছিল।
ভারত-বাংলাদেশের মোট ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি (২,২১৬ কিলোমিটার) পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। সীমান্তের প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার অংশ এখনও কাঁটাতারের বেড়াবিহীন রয়েছে, যার মধ্যে ১৭৪.৫১ কিলোমিটার এমন এলাকা রয়েছে যেখানে বেড়া নির্মাণ সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার এরইমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের (তাদের ভাষায়) বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট বা শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কারের পর্যায়ক্রমিক থ্রিডি অ্যাকশনের মুখোমুখি হতে হবে।
