সরকারকে বেশি দিন সুযোগ দেওয়া হবে না
চট্টগ্রামে জামায়াত আমির
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিএনপি সরকারকে বেশি দিন সুযোগ দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, সময় খুব সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে পরিবর্তন না হলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। গতকাল শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত ১১-দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, সরকারকে গণভোটের গণরায় মেনে নিতে হবে। সরকার যদি বর্তমান গণভোটের রায় বা জনদাবি স্বেচ্ছায় মেনে না নেয়, তবে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। ১৯৯৬ সালে নিজেরাই যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল এনে পাস করাতে বাধ্য হয়েছিল, এবারও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তা করতে বাধ্য হবেন। ভালোয় ভালোয় মেনে নিন। জনগণকে রাজপথে ঠেলে দেবেন না।
নেতা-কর্মীদের ‘জেল’ বা ‘ফাঁসি’র ভয় দেখিয়ে লাভ নেই বলে মন্তব্য করেন নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে তারা বারবার জেলে যেতে এবং জীবন দিতে প্রস্তুত। মনে রাখবেন, জেলের তালা বা চাবিওয়ালা কোনোটিই স্থায়ী নয়; দিন পরিবর্তন হয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে আপনারা একজন ‘সর্ব বিষয় বিশারদ’ মন্ত্রী পেয়েছেন, যিনি একাই সব মন্ত্রণালয় চালান। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কথাও তাকে বলতে হয়। আমার একটু কষ্ট লাগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য। তিনি বিভিন্ন জেলায় গিয়ে ভুলভাল তথ্য দিচ্ছেন। এমনকি কক্সবাজারে গিয়ে তিনি দাবি করেছেন যে বিরোধী দল নাকি বাজেটে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিবাদে মিছিল করেছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুয়া। প্রধানমন্ত্রীর পদটি একটি রাষ্ট্রীয় পদ; তার মুখ দিয়ে অনবরত এমন ভুল ও মিথ্যা তথ্য বের হওয়া জাতির জন্য লজ্জাজনক ও ক্ষতিকর। বাজেটের সমালোচনা করা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, এতে রাগ না করে আপনাদের ধৈর্য ধরা উচিত ছিল।
জাতীয় সংসদে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় সংসদে কথা বলার পরিবেশ না পেয়ে তাঁরা জনগণের সংসদে অর্থাৎ রাজপথে চলে এসেছেন। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ দেশ ও সীমান্ত রক্ষায় সজাগ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়ার আশা করেছিলেন জনগণ। কিন্তু বাস্তবে তা বেড়েছে। দুর্নীতিকে আজ জাতীয়করণ করা হয়েছে।
সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে বিরোধী দলের বাজেট সমালোচনার বিষয়ে মন খারাপ করেছেন; কিন্তু আমরা কেন প্রশংসা করব? এই বাজেটে দুর্নীতি, লুটপাট এবং ব্যাংক দখল বন্ধ করার কোনো রাস্তা রাখা হয়নি। এই বাজেটের কত টাকা জনগণের উন্নয়নে ব্যয় হবে; আর কত টাকা সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের পকেটে যাবে, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। এটি একটি বাস্তবতা–বিবর্জিত বাজেট, যা বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিতে হবে। দেশে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সংস্কার নিশ্চিত না হলে এই দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ হবে না।’
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে ব্যাংক দখল শুরু হয়েছে এবং ইসলামী ব্যাংককে আবার এস আলমের হাতে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। এস আলমের গাড়িতে চড়ে কে সংবর্ধনা নিয়েছিলেন এবং কারা তাকে প্রোটেকশন (সুরক্ষা) দিচ্ছেন, তা বাংলাদেশের জনগণ জানে। জনগণ এই দখলদারি কোনোভাবেই মেনে নেবে না ।
জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পুলিশের মারধরের ঘটনার কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন করতে হলে গণভোটের রায় অনুযায়ী পুলিশ, দুদক ও বিচার বিভাগ সংস্কার করতে হবে। গতকালও (শুক্রবার) চট্টগ্রামে একজন ক্রিকেটারকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছে। পুলিশ সংস্কার না হওয়ায় জনগণের ওপর আবারও জুলুম শুরু হয়েছে। সরকার যদি আবার স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটে, তবে জনগণকেও গণ-অভ্যুত্থানের পথে হাঁটতে হবে।
ভারত থেকে নতুন হাইকমিশনার আসার পরপরই মৌলভীবাজার সীমান্তে আবারও এক বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, সীমান্তে কাঁটাতার আর বন্দুকের গুলি দিয়ে কোনো বন্ধুত্ব হয় না। বাংলাদেশ ও ভারতের আকাশ এবং মাটি এক নয়; এর ফয়সালা ১৯৪৭ সালেই হয়ে গেছে। ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে বাংলাদেশে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি টিকে থাকবে না।’ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব) অলি আহমদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। মা-বোন ও মেয়েরা ঘর থেকে বের হতে বা স্কুল-কলেজে যেতে নিরাপদ বোধ করছে না। চোর-ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রমুখ।
