ক্রিকেটার নাঈমকে হেনস্তা পুলিশের তিন সদস্য ক্লোজড
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলে নিজ শহর চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে সিএনজিতে করে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। যাত্রাপথে গাড়ি থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়িতে উঠানো ও মারধরের ওই ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন নাঈম। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজার ফ্লাইওভারের মুখে এই
ঘটনা ঘটে। ক্রিকেটার নাঈম হাসানের অভিযোগ, তাকে ডিবি পরিচয়ে চেক করা হয়। একপর্যায়ে সাদা পোশাকে থাকা একজন ও দুই পুলিশ সদস্য তাকে মারধর শুরু করে। নিজের পরিচয় দেওয়ার পরেও সেই হেনস্তা থেকে রেহাই পাননি বলে জানিয়েছেন নাঈম।
এ ঘটনায় পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকসহ (এসআই) তিনজনকে নগরের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত একজনকে আটক করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী নাঈমের বাসায় গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ক্রিকেটার নাঈম হাসান জানান, ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম আসার কথা ছিল তাঁর। তবে বিলম্ব হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছান। এরপর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশা করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। অটোরিকশাটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের এক সদস্য থামার সংকেত দেন।
নাঈম হাসান বলেন, থামাতেই কয়েকজন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেন। এরপর তাঁকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। তবু তাকে ঘটনাস্থলে থাকা খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে কোমরে আঘাত করতে থাকেন। পুলিশের ওই এসআইয়ের সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা (পুলিশের সোর্স সোহেল) এক ব্যক্তিও হাতে থাকা পাইপ দিয়ে পেটান বলে জানান নাঈম হাসান।
মারধরের সময় ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হয়ে যায় জানিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, ‘প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমার ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। তারা বলছিল-তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।’ মারধরের একপর্যায়ে আরেকটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান। তিনি বলেন, পুলিশের গাড়ি থাকলেও সেখানে তাঁকে তোলা হয়নি। মারধরের একপর্যায়ে তাকে থানায় নিয়ে যান এসআই শফিকুল। এরপর ওসির কক্ষে নেওয়া হয় তাঁকে। ওসির কক্ষেও তাকে হেনস্তা করা হয়েছে বলে জানান নাঈম। তিনি বলেন, ওসিকে তিনি যখন ঘটনার বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন তখন ওসি বারবার বলেন চোখ নিচু করে কথা বলতে। এর মধ্যেই একটি ফোন পেয়ে ওসি শান্ত হন। নাঈম হাসান আরও বলেন, ‘অটোরিকশা থেকে নামানোর পর আমার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। থানায় আসার পর ফোনটি পেয়ে আমি বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোন করি। তিনি বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুকে বিষয়টি জানান। এরপর তারা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক লোক এসেছে থানায়। কিন্তু অন্য সাধারণ লোকের জন্য কেউ থানায় আসবে না। আর কাউকে যাতে এভাবে হয়রানির শিকার হতে না হয়।’
মধ্যরাতে নাঈমকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে হাজির হন তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরাও। ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি করেন তারা। গতকাল শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, ‘অভিযানের বিষয়ে এসআই শফিকুল ইসলাম আমাকে কিছু জানাননি। থানায় নিয়ে আসার পর ক্রিকেটার নাঈমের পরিচয় জানি। দুঃখ প্রকাশ করে সসম্মানে থানা থেকে তাঁকে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। তবে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা থানা থেকে যাবেন না জানান। পরে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।’ ওসি বলেন, ‘এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও অভিযানে থাকা আরেক কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিক ক্লোজ করা হয়েছে।’ পরে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর নাঈম চট্টগ্রামে নিজ বাসায় ফিরেছেন।
সিএমপি কমিশনারের দুঃখ প্রকাশ, অভিযুক্ত একজন আটক : ক্রিকেটার নাঈমকে হেনস্তার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ক্রিকেটার নাঈম হাসানের চট্টগ্রাম শহরের বাসভবনে যান। তিনি নাঈম ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং পুলিশের এমন আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। ক্রিকেটার নাঈমের বাসভবনে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আমরা ঘটনার সত্যতা পেয়েছি।
আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে চাই। পুলিশ সদস্যরা চরম অপেশাদার আচরণ করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সিএমপি কমিশনার আরও বলেন, অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যকে এরমধ্যেই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত একজনকে আটক করেছি। এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
সিএমপি সূত্র জানিয়েছে, পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে এবং দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্রিকেটার নাঈমের পরিবারের সদস্যরা জানায়, সিএমপি কমিশনার নিজে বাসায় এসে দুঃখ প্রকাশ করায় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা আপাতত আশ্বস্ত। তবে তারা চান যেন তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
