সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার

‘শিগগির দেশে আনা হবে’

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলার প্রেক্ষাপটে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসেন গতকাল রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দুদকের মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে ১২ জুন একটি চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষ। তবে বেনজীর আহমেদকে কোন মামলার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে কিংবা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না- এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‍্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তখনই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তার বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন আদালত।

এর আগে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর পৃথক চারটি মামলা করে দুদক।

বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে করা মামলায় বলা হয়, বেনজীর ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রী জীশান মীর্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। তাদের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।

এর আগে ২০২৪ সালের ১২ জুন বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ৮টি ফ্ল্যাট এবং ২৫ একর (১ একর সমান ৬০ দশমিক ৫ কাঠা) ২৭ কাঠা জমি জব্দ করার (ক্রোক) আদেশ দেন আদালত। এসব ফ্ল্যাট ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরে এবং জমি নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায়। এ ছাড়া দুই দফায় বেনজীর ও তার পরিবারের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। এ ছাড়া ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন আদালত।

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বেনজীরকে শিগগির দেশে আনা হবে- সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধির আওতায় দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। পুলিশ সদরদপ্তর জানায়, দুদকের মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় বেনজীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১২ জুন একটি চিঠি দিয়ে দুবাই পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১২ জুন আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমদকে আমিরাত পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।’

মন্ত্রী জানান, এর আগে বেনজীরের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। সেই নোটিশের ভিত্তিতেই ইন্টারপোল আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আটক করার অনুরোধ জানায়। ‘তিনি বর্তমানে সেখানে আটক আছেন। আমি এই মহান সংসদকে আরও জানাচ্ছি যে এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএই ফেডারেল ল’ অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে,’ বলেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার আইনের মামলা বিচারাধীন। এ বিষয়ে এনসিবি ঢাকা ইন্টারপোল চ্যানেলের মাধ্যমে রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও গ্রেপ্তার পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।’

‘তাকে প্রত্যার্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্সট্রাডিশনাল প্রপোজাল প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে এনসিবি আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয় করে অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে,’ বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালী হোক না কেন আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এ ঘটনা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।’