আদ্-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক পদ ছাড়লেন শেখ মহিউদ্দিন
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতক মৃত্যুর ঘটনার পর স্বেচ্ছায় আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালকের পদ ছাড়লেন ডা. শেখ মহিউদ্দিন। গতকাল মঙ্গলবার ফাউন্ডেশনের এক বিবৃতিতে এ খবর জানিয়ে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক জামালুন্নেসাকে ফাউন্ডেশনের নতুন নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে জানানো হয়, জামালুন্নেসা ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স করেন এবং পরে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিন থেকে পিএইচডি করেন। ২৫ বছরের বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর সম্প্রতি তিনি ‘স্বেচ্ছায়’ অবসরে যান।
আদণ্ডদ্বীন ফাউন্ডেশন পরিচালিত ৯টি হাসপাতালের একটি হলো মগবাজারের আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কোরবানির ঈদের আগের দিন ২৭ মে সকালে ওই হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। ওই ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি; দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকা; বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই শিশুগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শাও নোটিস দেওয়া হয়। সেই নোটিসের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ১১ জুন সরকার আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে। তিন দিনের মধ্যে রোগীদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নিতে বলা হয়।
এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে ১৩ জুন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেন, লাইসেন্স বাঁচাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ‘কোটি কোটি টাকা নিয়ে’ তার পেছনে ঘুরেছে। গত সোমবার বিকেলে আদ-দ্বীন হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডা. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদি দাবি করে থাকেন যে, আদ-দ্বীন হাসপাতাল তার পেছনে কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে, তাহলে সেই অভিযোগের প্রমাণ তাকেই দিতে হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টাকা নিয়ে কেন ঘুরব। এমন কিছু করিনি।’
আদণ্ডদ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি আদণ্ডদ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া শিশু মৃত্যু জনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সমস্ত দেশের সাথে আমরাও গভীরভাবে শোকাহত। ইতোমধ্যে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া তদারকি ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রোটকল পূণর্মুল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘সরকারের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আমাদের অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে দৃঢ়ভাবে ইচ্ছুক। আমরা ইতোমধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ পুরোদমে শুরু করেছি। আলো-বাতাস চলাচল তথা অক্সিজেনের উপস্থিতি সুগম করার জন্য তিনজন ইনডিপেনডেন্ট কনসালটেন্ট এর নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের কাজ চলমান। কর্পোরেট অফিসের উপরে অবস্থিত বেকারিটি আমরা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছি।’
বিবৃতিতে বলা হয়, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন ১৯৮০ সাল থেকে সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আয়বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
বর্তমানে আদ্?-দ্বীন ফাউন্ডেশনের অধীনে ৯টি হাসপাতাল, পাঁচটি মেডিকেল কলেজ, একটি নার্সিং কলেজ, চারটি নার্সিং ইনস্টিটিউট, একটি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি, একটি কলেজিয়েট স্কুল এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল করে ভুল করিনি- স্বাস্থ্যমন্ত্রী : ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের করে ‘কোনো ভুল কাজ করা হয়নি’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, অবহেলায় ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটবে আর তাদের কোনো শাস্তি হবে না, তা হতে পারে না। ‘প্রথমে আমরা লাইসেন্সটা বাতিল করেছি। আমি মনে করি না কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মঙ্গলবার সকালে হাম চিকিৎসা-সংক্রান্ত ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ঈদের মধ্যে বাড়িতে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে যেতে পারিনি। তবে পরে সেখানে গিয়ে দেখি, ওই রুমে কোনো জানালা নেই, একটি মাত্র দরজা। ছয় নবজাতকের সঙ্গে একটি ছোট রুমে ২৫ জনকে রাখা হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। আর বাচ্চারা মারা গেছে।’ হাসপাতালের ‘অবহেলায়’ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সেখানে ওই সময় কোনো ডাক্তার, নার্স ছিল না। যারা ছিল তারাও বাচ্চাদের মায়েদের কথার গুরুত্ব দেয়নি। কোরবানির ঈদের আগের দিন ২৭ মে সকালে মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতক মারা যায়। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়।
