আতিউরসহ ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দায়ী
রিজার্ভ চুরির মামলায় হচ্ছে চার্জশিট
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় এক দশকের তদন্ত শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় অভিযোগপত্র দিতে যাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানসহ ১০ বাংলাদেশি রয়েছেন। এ ছাড়া ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, ভারত ও উত্তর কোরিয়ার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থাকছে আসামির তালিকায়।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, ‘আমাদের তদন্ত শেষ হয়েছে, তদন্তে আমাদের আর কোনো কাজ বাকি নেই। আশা করছি শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দিতে পারব।’ এরইমধ্যে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে (ফেড) রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। এর মধ্যে একটি মেসেজের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় একটি ‘ভুয়া’ এনজিওর নামে ২০ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেওয়া হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়। বাকি চারটি মেসেজের মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেওয়া হয় ফিলিপিন্সের মাকাতি শহরে রিজল কমার্সিয়াল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায় ‘ভুয়া তথ্য’ দিয়ে খোলা চারটি অ্যাকাউন্টে। অল্প সময়ের মধ্যে ওই অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়, ফিলরেম মানি রেমিটেন্স কোম্পানির মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রা পেসোর আকারে সেই অর্থ চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোর কাছে। এর মধ্যে একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও বাকি অর্থ উদ্ধারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। জুয়ার টেবিলে হাতবদল হয়ে ওই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে, তারও কোনো হদিস মিলছিল না। এ নিয়ে আরসিবিসির বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মামলা চলছে। অর্থ রূপান্তর, চুরি, আত্মসাৎ- এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তা বা প্ররোচনা, জালিয়াতি, জালিয়াতিতে সহায়তা বা প্ররোচনাসহ বেশ কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে সেখানে।
মামলায় বলা হয়, রিজার্ভের অর্থ চুরির কাজে ‘অজ্ঞাতনামা উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের’ সহায়তা নেয় আসামিরা। ‘নেস্টেগ’ ও ‘ম্যাকট্রাক’ এর মত ম্যালওয়্যার পাঠিয়ে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট নেটওয়ার্কে ঢোকার জন্য পথ বের করে। পরে নিউ ইয়র্ক ফেড থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া হয় নিউ ইয়র্ক ও ফিলিপিন্সে আরসিবিসির অ্যাকাউন্টে।
ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই সাইবার জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মানুষ বিষয়টি জানতে পারে ঘটনার এক মাস পর, ফিলিপিন্সের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে।
বিষয়টি চেপে রাখায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন। তবে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে দায়ের করা ওই মামলায় সরাসরি কাউকে আসামি করা হয়নি তখন।
মামলাটি শুরু থেকেই তদন্ত করছে সিআইডি। সবশেষ গত ১৮ মে মামলাটির প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯৫ বারের মত পেছানো হয়। সেদিন আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২ জুলাই দিন ঠিক করে দেয়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর গত বছরের জানুয়ারিতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নিতে চেয়ে সিআইডিকে চিঠি দিয়েছিল দুদক। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তভার হস্তান্তরে রাজি হয়নি, শেষ পর্যন্ত সিআইডির তরফেই ঐতিহাসিক এ মামলার অভিযোগপত্র দেওয় হচ্ছে।
সিআইডি বলছে, দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অভিযোগপত্র প্রস্তুত করতে ফরেনসিক প্রতিবেদন, ফিলিপিন্সের এমএলএআর, এফবিআই রিপোর্ট, জাপান ও ভারতের সুপারিশ, শ্রীলঙ্কা থেকে অর্থ ফেরতের রেকর্ড, সুইফটের তথ্য, তদন্তের ডকুমেন্টারি ও ১৬১ ধারায় নেওয়া জবানবন্দি আমলে নেওয়া হয়েছে।
দশ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট এবং খসড়া অভিযোগপত্রে অপরাধের বিস্তর তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে।
সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেছেন, খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুতের পর গত মার্চেই আইনি পরামর্শ নিতে তা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ফেরত এলেই তা আদালতে জমা দেওয়া হবে। এর বাইরে কোনো আইনি পরামর্শ এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যেসব বাংলাদেশির নাম থাকছে অভিযোগপত্রে : তদন্তে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে গাফিলতি, ঘটনা গোপন করা, আলামত মুছে দেওয়ার চেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ওই সময়ের ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি আনিস এ খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক কেএম আবদুল ওয়াদুদ, সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম, তৎকালীন উপ-মহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের সাবেক উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা, ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. সুলতান মাসুদ আহম্মেদ ও গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামানের নাম রয়েছে।
আসামিদের মধ্যে ফিলিপিন্সের যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান : বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপিন্সের কাম সিন ওং, মায়া সান্তোস দেগুইতো, রাউল ভিক্টর বি তান, ব্রিজিট আর কাপিনা, নেস্তর ও পিনেদা, রোমুয়ালদো এস আগারাডো, অ্যাঞ্জেলা রুথ এস টরেস, লোরেঞ্জো তান, মিস ন্যান্সি, জাও কিওগ, ডেনিস সি ব্যানকোড, ইসমায়েল আর রেইস, সাবিনো এম ইকো, লিজেন্ড জে রাসেলা, রিচার্ড ইনসাইন, উইলিয়াম সোঁ গো (তিনি মারা গেছেন), সালুদ রেইস বাউতিস্তা শেবা, মিশেল বাউতিস্তা কনকন, অ্যান্টনি এ পেলেজো, জন ইউ, লুইস ফাব্রেগাস খো, ম্যান পো চান, মিং ই সাইমন সি, রোজালিও পরানতা তান্দুয়ান, এনরিকে কে রাজোন, টমাস আরাসি, জোসে এডুয়ার্ডো জে আলারিলা, ক্রিশ্চিয়ান আর গনজালেস, ডোনাটো সি আলমেইদা ও ফ্লিন্ট রিচার্ডসনের নাম এসেছে।
এ ছাড়া দেশটির রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন, ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকর্পোরেশন, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকর্পোরেশন, মাইডাস ক্যাসিনো ও সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোর নাম রয়েছে আসামির তালিকায়।
শ্রীলঙ্কার ৭ ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠান : শ্রীলঙ্কার আসামিদের মধ্যে হেগোডা গামাগে শালিকা পেরেরা, ইমিয়াগে ডন মিউরিন রানাসিংহে, রামানায়েক আরাচ্চিগে ডন প্রদীপ রোহিত দামকিন, বুলুগাহা আরামবেগেদারা সাঞ্জিবা তিসা বান্দারা, ওয়েরাপুলি মুহান্দিরামগে প্রিয়াঙ্কা জয়দেব, লুয়াইস হান্নাদিগে শিরানি ধম্মিকা ফার্নান্দো ও নিশান্ত নলক ওয়ালাকুলু আরাচ্চি নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে শালিকা ফাউন্ডেশনের নাম রয়েছে।
এ ছাড়া ভারতের নাগরিক নীলাভান্নান মাদুক্কুর আনন্দন, প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আত্রেশ ও রাকেশ আস্তানা, উত্তর কোরিয়ার পার্ক জিন হিয়োক ও সংগঠন হিসেবে লাজারাস গ্রুপ, চীনের ৩ নাগরিক ডিং ঝিজে, গাও শুহুয়া ও ওয়েইকাং জু এবং জাপানি নাগরিক সাসাকির নাম থাকছে অভিযোগপত্রে।
