যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্ট
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রকাশিত অন্তর্বর্তী চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেছেন। পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে বুধবার এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তারা। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান উভয়েই ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় সমঝোতা স্মারকটিতে ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর করেছেন বলে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বুধবার থেকে অন্তর্বর্তী চুক্তিটি কার্যকর হওয়া শুরু হয়ে গেছে। ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে একটি জমকালো নৈশভোজ শুরুর আগ মুহূর্তে ট্রাম্প এই সমঝোতা চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন, জানিয়েছে রয়টার্স। এই চুক্তিতে ইরানি কর্মকর্তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার আক্রমণ শুরু করবে ও এই কর্মকর্তাদের হত্যা করবে বলে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প জি৭ সম্মেলনে যোগ দিয়ে অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে এখন ফ্রান্সে আছেন। চুক্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে আক্রমণ করার পেছনে তার দেওয়া অন্তত একটি যুক্তি প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র না থাকাটা ‘অন্যায্য’ হবে। অথচ আগে ইরানের এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিশ্চিহ্ন করার প্রত্যয় জানিয়েছিলেন তিনি।
এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানকে নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে আমরা ওদের ওপর বোমা মেরে সব ধ্বংস করে দেব। আমি চাই না তারা তা (করুক)। আমি চাই তারা চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাক।’ এ সময় তিনি ইরানিদের ‘স্মার্ট মানুষ’ বলে অভিহিত করেন। দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে যে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানিয়েছেন, যেহেতু চুক্তিটি ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর হয়ে গেছে তাই সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে কোনো স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে না। তবে এর পরবর্তী ৬০ দিনে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছতে আলোচনা শুরু করবেন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এই চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি আনবে আর তেলের দাম কমাবে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমি এটি (চুক্তি) পছন্দ না করি, তারা যদি ভালো আচরণ না করে, আমরা গিয়ে ঠিক তাদের মাথার মাঝখানে বোমা ফেলব, ঠিক আছে?’
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানি নেতারা মুহূর্তটি উদযাপন করার সময় ট্রাম্পের এই নতুন হুমকি নিয়ে কিছু বলেননি। তারা চুক্তির ছবি প্রকাশ করেছেন। এই চুক্তিকে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত প্রথম চুক্তি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি পক্ষের নেতৃত্ব দেওয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ বলেন, ‘সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার কয়েকগুণ বেশি পেয়েছি, এ নিয়ে কোনো তুলনাই চলে না।’
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ১৪ অনুচ্ছেদ : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ১৪ অনুচ্ছেদ রয়েছে, যা এখানে তুলে ধরা হলো-
১. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছে। তারা অঙ্গীকার করছে যে, ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না, হুমকি বা বলপ্রয়োগ থেকেও বিরত থাকবে এবং লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। চূড়ান্ত চুক্তি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং এই অনুচ্ছেদের বাকি বিষয়গুলোকে অনুমোদন করবে।
২. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
৩. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা সম্পন্ন করে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করছে। পারস্পরিক সম্মতিতে এই মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।
৪. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তার নৌ অবরোধ ও যেকোনো ধরনের বাধা বা হয়রানি প্রত্যাহার শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নৌ অবরোধের অবসান ঘটাবে। এ সময়ে ইরান যুদ্ধ-পূর্ব বাণিজ্যিক চলাচলের অনুপাতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করবে। এছাড়া, চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে তার সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করবে।
৫. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ৬০ দিনের জন্য বিনামূল্যে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীতমুখী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ও মাইন অপসারণের কাজ শেষ হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে। ইরান ওমানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন এবং হরমুজ প্রণালীর উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রণালী পরিচালনা ও সামুদ্রিকসেবা নির্ধারণে আলোচনা করবে এবং পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য উপকূলীয় দেশের সঙ্গেও মতবিনিময় করবে।
৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে, দেশটি আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে অন্তত ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও উভয় পক্ষের সম্মতিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে ৬০ দিনের মধ্যে এবং সেটা করা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড় ও অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। ৭. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক একতরফা নিষেধাজ্ঞাসহ ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা একটি সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী প্রত্যাহার করবে। উভয় পক্ষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করছে এবং এ বিষয়ে দ্রুত সমাধানে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
৮. ইরান পুনরায় নিশ্চিত করছে যে, তারা কোনো পারমাণু অস্ত্র উৎপাদন বা অর্জন করবে না। উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে যে,সংরক্ষিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং ৭ নম্বর ধারায় উল্লেখিত সময়সূচি অনুযায়ী, অন্তত স্থানীয়ভাবে পাতলা করার পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে নিষ্পত্তি করা হবে।
উভয় পক্ষ ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং অন্যান্য সম্মত বিষয় নিয়েও আলোচনা করবে। এসব বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে অনুমোদিত হবে। উভয় পক্ষ পারমাণবিক ইস্যুগুলোর গুরুত্ব স্বীকার করে এবং এ বিষয়ে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
৯. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিদ্যমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী মোতায়েন করবে না।
১০. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে, এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই এবং নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও তাদের উপজাত রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের (ট্রেজারি) ছাড়পত্র জারি করবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা,পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট সকল সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
১১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে, এই সমঝোতা স্মারক কার্যকরের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সীমাবদ্ধ বা জব্দকৃত অর্থ ও সম্পদ সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। এসব অর্থ মুক্ত করার পদ্ধতি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনার সময় দ্বিপাক্ষিকভাবে একমত হবে। এই অর্থ মূল হিসাবে সংরক্ষিত থাকুক বা অন্যত্র স্থানান্তরিত হোক, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাদের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হিসেবে নির্ধারণ করবে তাদের অর্থপ্রদানের জন্য তা সম্পূর্ণরূপে ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
১২. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে যে, এই সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির প্রতি আনুগত্য পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বাস্তবায়ন ও তদারকি ব্যবস্থা (মেকানিজম) গঠন করা হবে।
১৩. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর এবং এর ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়া ও তা অব্যাহত থাকার শর্তে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি সম্পর্কিত আলোচনায় প্রবেশ করবে, যা কেবল এই সমঝোতা স্মারকের অন্য অনুচ্ছেদগুলোর ওপর ভিত্তি করে হবে।
১৪. চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত ও নিশ্চিত করা হবে।
