বাজেট বাস্তবায়নে প্রকৃত ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিশাল অঙ্কের যে বাজেট দিয়েছে, তার পুরো বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রায় চার লাখ কোটি টাকার প্রকৃত ঘাটতি দেখা দিতে পারে ধারণা করছে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট-র‌্যাপিড। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সিরডাপ মিলনায়তনে নতুন সরকারের বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে এসে এক উপস্থাপনায় ওই ধারণা তুলে ধরে বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটি।

র‌্যাপিড চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘আমি বলতে চাই, যদি সরকার মনে করে তারা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করবে, তাহলে এই বাজেট ঘাটতি কিন্তু ২ লক্ষ ৪৩ হাজার (বাজেটে লক্ষ্য) থেকে অনেক অনেক বেশি হবে।’ এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এনবিআর জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে সেখানে ‘অন্ততপক্ষে এক লাখ কোটি টাকার’ ঘাটতি থেকে যাবে। ‘এই বছরে (অর্থবছর ২০২৬-২৭) তাদের ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি’ রেভিনিউ পারফরম্যান্স যদি হয়, তারপরেও আমাদের ধারণা, এক লাখ কোটি টাকার একটা ঘাটতি কিন্তু হবে। এনবিআরকে যে টার্গেট দেওয়া হয়েছে সেটার হিসাবে। ‘এবং এটা কেন বললাম, আপনারা সবাই জানেন যে এনবিআরের গত দিনগুলোর পারফরম্যান্স কী আছে। প্রত্যেক বছরের বাজেটে সরকার বড় বড় রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেয়, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু এনবিআর আসলে পারে না সেই রাজস্ব সম্পূর্ণ আদায় করতে।’ এর সঙ্গে সরকার যে বিদেশি ঋণ ধরে বাজেট অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেখানেও ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ কম মিলবে বলে ধারণা করছেন কমনওয়েলথ সচিবালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সাবেক প্রধান এম এ রাজ্জাক। তার ভাষ্য, ‘বিদেশ থেকে যে ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, আমরা মনে করি সেই ঋণও পুরাটা পাওয়া যাবে না। আগামী বছরে আমরা খুব ভালো করলেও যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ আনতে পারব এবং আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা, সেটার মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার একটা ঘাটতি থাকবে।’ গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটে সরকার ঘাটতি পূরণে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। রাজ্জাক বলেন, ‘সারা বিশ্বে টোটাল বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ অসম্ভব গতিতে নিচে নামা শুরু করেছে। ২০২৩ সালে সারা বিশ্বে ২৩২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সাহায্যের ফ্লো ছিল। সেটা কমতে কমতে এখন ১৫৩ বিলিয়ন ডলারে এসেছে।’

উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সীমিত আয়ের মানুষ যখন চাপে রয়েছে, তখন ‘স্থিতিশীলতা তৈরি না করে’ সরকার উচ্চ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য ধরেছে, তা মূল্যস্ফীতি আরও ‘উসকে’ দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন র‍্যাপিড চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন- আমরা কি স্ট্যাবিলাইজেশনকে কম গুরুত্ব দিচ্ছি? স্ট্যাবিলাইজেশনে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে যদি কেবল রিকভারি বা গ্রোথকে (প্রবৃদ্ধি) বুস্ট করতে চাই, তবে মূল্যস্ফীতি কমবে না এবং অর্থনীতির স্থিতি অর্জন করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

‘গত চার বছরের ইনফ্লেশনের কারণে সাধারণ জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় অনেক কমেছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিসটিক্স শেষ যে পভার্টি (দারিদ্র্য) জরিপ করেছিল, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ পভার্টি লাইনের (দারিদ্র্যসীমা) নিচে চলে গেছে।’

রাজ্জাক বলেন, ‘রিকভারি বা পুনরুদ্ধার জরুরি; কিন্তু তা অবশ্যই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা স্ট্যাবিলাইজেশনের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেশি পুশ করলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য রুবানা হক, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার এবং র‍্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবু ইউসুফ এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।