হরমুজ প্রণালী আবার বন্ধ করল ইরান

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। লেবাননে ইসরায়েলের হামলাকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের স্বাক্ষরিত চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে হরমুজ বন্ধ করেছে ইরান। গতকাল শনিবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে খাতামণ্ডআল আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স বলেছে, ‘সব ধরনের নৌযান চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। শত্রুর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই প্রথম এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদি এই আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তাহলে শত্রুকে তার বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করতে পরবর্তী পদক্ষেপ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।’

ইরান-সমর্থিত লেবাননের প্রতিরোধ সংগঠন হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও লেবাননের কোনো ভূখণ্ড দখল করার যেকোনো ইসরায়েলি প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি বলেছে, গত রাতে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহর কাছাকাছি এক এলাকার দিকে অগ্রসর হওয়া ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা।

শুক্রবার রাত থেকে শুরু এবং গতকাল পর্যন্ত চলমান ইসরায়েলি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করেছে হিজবুল্লাহ। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী বলেছে, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে তারা যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে মেনে আসছিল, এমনকি ইসরায়েল একেবারে প্রথম মুহূর্ত থেকে এটি লঙ্ঘন করার পরও।

হিজবুল্লাহ বলেছে, তবে শত্রুর প্রতারণা এবং বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসের কথা মাথায় রেখে তারা সম্পূর্ণ সতর্ক এবং যেকোনো জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে।

হরমুজে ‘প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ’ গঠন, ৪৮ ঘণ্টা আগে দিতে হবে নোটিশ : হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজের জন্য একটি নতুন বাধ্যতামূলক অনলাইন ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা চালু করেছে ইরান। নতুন নিয়মটি কার্যকর করেছে ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’। এখন থেকে জাহাজগুলোকে তাদের চলাচলের অনুমতি নিতে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন সিস্টেমে নিবন্ধন করতে হবে। তবে, আগামী ৬০ দিনের জন্য ট্রানজিট ফি মওকুফ থাকবে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, জাহাজ পরিচালনাকারীদের অবশ্যই এর ওয়েবসাইট অথবা নির্ধারিত ই-মেইল এর মাধ্যমে ট্রানজিট আবেদন জমা দিতে হবে। অন্য কোনো মাধ্যম গ্রহণযোগ্য হবে না। এছাড়া জাহাজের জন্য অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে আগমনের নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালির প্রবেশ ও প্রস্থানে কোনো বিলম্ব না ঘটে।

পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নৌ-নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষা সংক্রান্ত কোনো ফি এই ৬০ দিনের মধ্যে নেওয়া হবে না; এসব খরচ ইরান সরকার বহন করবে। মাইন-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে নির্ধারিত রুট ও সময়সূচি মেনে চলা বাধ্যতামূলক। নিয়ম না মানলে এর সম্পূর্ণ দায় জাহাজ মালিকদের ওপর বর্তাবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই উদ্যোগটি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক-এর অংশ। এ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাত নিরসন এবং আঞ্চলিক নৌ-চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো চুক্তিভঙ্গের জবাব হবে আরও শক্ত ও কঠোর : ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভঙ্গ করে বা এর মূল কাঠামো থেকে সরে আসে তাহলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের সমর্থন নিয়ে আগের চেয়ে আরও কঠোর ও শক্তিশালী জবাব দেবে।

ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় লিখেছেন, ইরানি জনগণের সাহসী প্রতিরোধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আলোচনার টেবিলে বসা এবং ইরানের শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না।

তিনি বলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ইরানি জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সমঝোতা স্মারকের সব ধারা আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করা। এর মধ্যে লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ‘ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর’ দ্রুত প্রত্যাহারও অন্তর্ভুক্ত।

আজিজি জোর দিয়ে বলেন, সমঝোতা স্মারকের প্রতি যেকোনো ধরনের অঙ্গীকার ভঙ্গ বা এর মূল কাঠামো থেকে বিচ্যুতি ঘটলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বীর জনগণের সমর্থনে অতীতের তুলনায় আরও দৃঢ়, কঠোর ও জোরালো প্রতিক্রিয়া জানাবে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও লেবাননে হামলা চলছেই, নিহত ১১ : ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ২৪ ঘণ্টাও পেরোনোর আগেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং কামানের আঘাতে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী এক ডজনেরও বেশি এলাকা লক্ষ্য করে এই হামলা চালায়, যার বেশিরভাগই নাবাতিহ শহরের কাছাকাছি।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহ ৫০টিরও বেশি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর তারা হিজবুল্লাহর আস্তানায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। বিবিসি লিখেছে, লেবাননে ইসরায়েলের এ চলমান সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটন। গত মার্চ মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে লেবানন কার্যত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে।

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে উত্তেজনা চলতে থাকলে তা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ওই চুক্তিতে লেবাননসহ ‘সব ফ্রন্টে’ যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তেহরানও জোর দিয়ে বলেছে, যুদ্ধ অবসানের যেকোনো বৃহত্তর চুক্তিতে অবশ্যই লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এ চুক্তিকে আরও মজবুত করতে এবং প্রাথমিক আলোচনা সারতে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সবশেষ বিমান হামলা নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গত শুক্রবার ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর এক মুখপাত্র বলেছিলেন, তাদের বাহিনী ‘তাৎক্ষণিক হুমকি দূর করার কাজ অব্যাহত রাখবে’।

ইরান সমর্থিত লেবাননের শিয়া মুসলিম রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর নিজের দেশে চাপ রয়েছে।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে তারাও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাবে।

হোয়াইট হাউস চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে লেবাননে ইসরায়েল সরকারের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে বলেছিল, এর ফলে শান্তি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তবে ওয়াশিংটনের কাছে নতুন ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বিমানের মোড়ক উন্মোচনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রশংসা করে তাকে একজন ‘যোদ্ধা’ বলে বর্ণনা করেন।

হিজবুল্লাহ গত মার্চের শুরুতে যখন ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালালে তার পাল্টায় লেবাননজুড়ে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে ইসরায়েল। নিজেদের উত্তর সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের হটিয়ে দেওয়ার উদ্দেশে ইসরায়েল বর্তমানে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৫ শতাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে।

এই সংঘাতের ফলে লেবাননে এখনও প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আছেন এবং দক্ষিণাঞ্চলের বহু এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।