দৃষ্টি সুইজারল্যান্ডে, নিবিড় আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক

সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল রোববার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, এ বৈঠকের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী চুক্তির আশা করা হচ্ছে। এতে উভয় দেশের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত সমস্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বৈঠকের আগে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগনাজিও ক্যাসিসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বৈঠকের একটি ছবিও প্রকাশ করেছেন।
ক্যাসিস বলেন, চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও সুইজারল্যান্ড ও ইরানের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, নিরাপত্তা এবং কূটনীতির সেবায় ভূমিকা রাখবে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনার জন্য বিশেষ কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছে। তারা সমঝোতা স্মারকের সকল দিক খতিয়ে দেখবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন তদারকি, অগ্রগতির ওপর নজর রাখা এবং চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করার জন্য ‘ফলো-আপ’ গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, দীর্ঘ ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সব পক্ষের আন্তরিকতা রয়েছে। আলোচনা প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কাতার লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখতে পাকিস্তানসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। সংঘাত ও বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম পথ হলো সংলাপ এবং কূটনীতি।
উল্লেখ্য, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান লড়াই এবং ইরান গতকাল পুনরায় ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ ঘোষণা করে। এ ঘটনার পর উদ্ভূত উত্তজনায় আলোচনাটি বিলম্বিত হয়।
ইরানের দাবি, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলাকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের স্বাক্ষরিত চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে হরমুজ বন্ধ করেছে ইরান।
দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে খাতামণ্ডআল আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স বলেছে, ‘সব ধরনের নৌযান চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। শত্রুর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই প্রথম এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
হরমুজ খুলতে দুই শর্ত ইরানের : লেবাননে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর ও চুক্তির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল প্রত্যাশিত চুক্তির আলোচনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রোববার ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ওই সূত্র বলেছে, ইরানের তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওই নৌপথ বন্ধই থাকবে। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরুর বিষয়টি রোববার নিশ্চিত করেছে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে রোববার সুইজারল্যান্ডে ?‘লেক লুসার্ন শীর্ষ সম্মেলন এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রথম বৈঠক শুরুর’ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং দুই মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ দেশ কাতার বলছে, এই বৈঠক একটি ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে; যা সমঝোতা স্মারকের সব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করবে। বিবৃতিতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরেও বলা হয়েছে, লেবাননে বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের জব্দ থাকা সম্পদ নিয়ে আলোচনা করতে ইরান, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসেছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, ‘লেবাননে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ সচল করার বিষয়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যে বর্তমানে আলোচনার নির্ধারিত স্থানে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’
যুদ্ধকে ভয় পাই না, তবে তা কারও জন্যই কল্যাণকর নয় : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান যুদ্ধকে ভয় পায় না, তবে যুদ্ধ কোনো পক্ষের জন্যই উপকারী নয়। ইরানের বরাতে জানা যায়, গতকাল রোববার তেহরানে অনুষ্ঠিত ৩৩তম মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধ কারও স্বার্থে নয় এবং এর ধারাবাহিকতা কোনো গোষ্ঠীর জন্যই লাভজনক হতে পারে না। আন্তর্জাতিক গবেষণাও দেখিয়েছে যে, যুদ্ধ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি করে। তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে ইরান যুদ্ধকে ভয় পায়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং জনগণ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে তারা দৃঢ়ভাবে নিজেদের অবস্থানে অটল রয়েছে। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে তারাও শক্তভাবে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমঝোতার অধিকাংশ ধারা ইরানি জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্বেগ হলো ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা। তিনি উল্লেখ করেন, এ বিষয়টি ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা বারবার গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন এবং ইরানও বহুবার একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইরানের শর্তের কাছে ইসরায়েল আবারও আত্মসমর্পণ করেছে- হিব্রু গণমাধ্যম : ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেল আবিবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের পর লেবাননে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ইসরায়েলের রাজনৈতিক কর্মকর্তারা আবারও ইরানের শর্তের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ইসরায়েলি চ্যানেল-১২ নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তেল আবিবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর লেবাননে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি চ্যানেল ১২ আরও জানিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের আদেশে ইসরায়েলে সম্পূর্ণ নীরবতা বিরাজ করছে।
এদিকে, ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর চ্যানেল-১৩ একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় তেল আবিবকে লেবাননে উত্তেজনা বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকতে বলেছে, যাতে সুইজারল্যান্ডে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ অবস্থায় ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ওলমার্ট নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, বেশিরভাগ ইসরায়েলি তার ব্যর্থতার জন্য তাকে ক্ষমা করবে না এবং তার নীতিগুলো শুরু থেকেই ব্যর্থ ছিল। একই সময়ে, অধিকৃত অঞ্চলে একটি নতুন জরিপে দেখা গেছে যে, এই অঞ্চলের অধিকাংশ বাসিন্দা চান নেতানিয়াহু রাজনৈতিক অঙ্গন ছেড়ে দিন।
ইসরায়েলি চ্যানেল ১২ এর এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যে আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনর্নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত নয়।
